সবশেষ ভোর সাড়ে ৪টার দিকে কক্সবাজার পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্তার ঘোনা এলাকায় এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। আকস্মিকভাবে পাহাড়ের একটি বিশাল অংশ ধসে স্থানীয় বাসিন্দা আলী আকবরের (৫০) বসতঘরের ওপর আছড়ে পড়ে। এতে আলী আকবরসহ তাঁর পরিবারের তিন সদস্য মাটির নিচে চাপা পড়ে গুরুতর আহত হন। স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ হাশেম সেই ভয়াবহ মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘হঠাৎ বিকট শব্দে পাহাড়ের একটা অংশ ঘরের ওপর ভেঙে পড়ে। আমরা আশপাশের লোকজন ছুটে এসে দ্রুত মাটি খুঁড়ে তাঁদের তিনজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠাই।’ তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসক আলী আকবরকে মৃত ঘোষণা করেন। কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং আহত বাকি দুজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
অন্যদিকে, সবচেয়ে বড় বিপর্যয়টি ঘটেছে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে। রাত ৩টার দিকে ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে দুই বোন ও দুই শিশুসহ একই ব্লকের চারজন প্রাণ হারান। নিহতরা হলেন— উম্মে হাবিবা (২৭), তাঁর ছোট বোন তানজিনা আক্তার (১৩) এবং দুই শিশু ভাই মোহাম্মদ রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩)। এর কিছু আগে রাত ১টা ৪৫ মিনিটের দিকে কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধসে একরাম নামে ৭ বছর বয়সী এক শিশু মাটির নিচে চাপা পড়ে মারা যায়। ক্যাম্পের মাঝি এনায়েত উল্লাহ জানান, রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকরাই মাটি সরিয়ে শিশুটির নিথর দেহ উদ্ধার করে। এর মাত্র আধা ঘণ্টা আগে পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী ক্যাম্পে পাহাড়ধসে মাটিচাপা পড়েন একই পরিবারের তিনজন। সেখান থেকে রোহিঙ্গা যুবক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন (৪৪), তাঁর স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং তাঁদের মাত্র ৪ বছর বয়সী সন্তান মোহাম্মদ আনাসের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা জানান, প্রায় একই সময়ে ঘটনাগুলো ঘটায় রাতভর ফায়ার ফাইটার ও স্বেচ্ছাসেবকরা নিরলস উদ্ধার অভিযান চালিয়েছেন।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট সুস্পষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান সতর্ক করে বলেছেন, এই ভারী বর্ষণ আরও অন্তত দুইদিন অব্যাহত থাকতে পারে। এই পরিস্থিতিতে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের জীবন রক্ষার্থে মাঠে নেমেছে প্রশাসন। উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, ‘ভারী বর্ষণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি চরম আকার ধারণ করেছে। আমরা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।’ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি করা হলেও অবিরাম বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী হাজারো মানুষের চোখে এখন শুধুই নির্ঘুম আতঙ্কের রাত।