সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 96
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার মহেশপুরতলী গ্রাম এখন সারাদেশের মানুষের কাছে ‘হাঁসের গ্রাম’ হিসেবে এক অনন্য পরিচিতি লাভ করেছে। একসময়ের চরম দারিদ্র্যপীড়িত ও অবহেলিত এই প্রত্যন্ত জনপদটি আজ বাণিজ্যিকভাবে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক উজ্জ্বল ও অনুপ্রেরণাদায়ী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এই গ্রামের খামারে উৎপাদিত হাঁসের বাচ্চার সুনাম ও মান এখন স্থানীয় এলাকার গণ্ডি ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
বর্তমানে প্রতিদিন এখানে প্রায় ১২ থেকে ১৪ লাখ হাঁসের বাচ্চা উৎপাদিত হচ্ছে, যা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের খামারিদের বিশাল চাহিদা পূরণ করছে। মহেশপুরতলী গ্রামের এই অভাবনীয় সফলতার নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয়দের প্রায় তিন দশকের কঠোর পরিশ্রম, সততা ও প্রবল কর্মউদ্যম। ১৯৯৭ সালে স্থানীয় বাসিন্দা শাহ আলমের হাত ধরে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনের এই ক্ষুদ্র ও চ্যালেঞ্জিং যাত্রা শুরু হয়। তৎকালীন সময়ে হাতেগোনা কিছু ডিম থেকে অত্যন্ত সাধারণ ও কৃত্রিম উপায়ে বাচ্চা ফুটানোর যে সাহসী পরীক্ষা তিনি করেছিলেন, তা আজ একটি বৃহৎ ও লাভজনক গ্রামীণ শিল্পে রূপ নিয়েছে। সময়ের বিবর্তনে এবং আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এখানে বৈদ্যুতিক ইনকিউবেটরের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়েছে। ফলে উৎপাদন ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে গেছে, যা মহেশপুরতলী গ্রামকে আজ দেশের অন্যতম বৃহত্তম হাঁস উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করেছে।
এই শিল্পের হাত ধরে মহেশপুরতলী গ্রামের মানুষের ভাগ্যের আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। গ্রামের প্রতিটি পরিবার এখন কোনো না কোনোভাবে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন ও বিপণন ব্যবসার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছে। আগে যেখানে তীব্র অভাব-অনটনের কশাঘাতে জর্জরিত হয়ে এই অঞ্চলের গ্রামবাসীর দিন কাটত, এখন সেখানে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনই তাদের প্রধান এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জীবিকা। গ্রামটির নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিদিন এই বিশাল কর্মযজ্ঞে শ্রম দিচ্ছেন। স্থানীয় খামারিদের মতে, শুরুতে ছোট পরিসরে লোকসান ও নানা ঝুঁকির মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে তাদের আয়ের পথ অনেক সুগম ও নিরাপদ হয়েছে।
অনেকেই নিজস্ব উদ্যোগে বড় বড় বৈদ্যুতিক ইনকিউবেটর স্থাপন করে প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে তারও বেশি টাকা অনায়াসে আয় করছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা অত্যন্ত গর্বের সাথে জানান, এই কুটির শিল্পের কল্যাণেই এখন গ্রামের মানুষের সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান আগের চেয়ে অনেক উন্নত ও স্বাচ্ছন্দ্যময় হয়েছে। একইসাথে বিস্তৃত হচ্ছে এই পণ্যের বাজার ও নতুন কর্মসংস্থান। মহেশপুরতলীতে উৎপাদিত হাঁসের বাচ্চার গুণগত মান অত্যন্ত ভালো ও রোগমুক্ত হওয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বড় বড় পাইকাররা প্রতিদিন এখানে ছুটে আসেন।
বিশেষ করে কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট ও বরিশালসহ দেশের নানা অঞ্চলের সফল ব্যবসায়ীরা সরাসরি এখান থেকে পাইকারি দরে বিপুল পরিমাণ বাচ্চা সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছেন। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে বেকার যুবকদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে সচল করেছে নতুন গতির সঞ্চার।
এই অগ্রযাত্রায় উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ খামারিদের নিয়মিত ভ্যাকসিন প্রদান, রোগ প্রতিরোধের পরামর্শ এবং আধুনিক প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দিয়ে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করে যাচ্ছে। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ কে এম আসাদুল হক জানান, গ্রামীণ উদ্যোগ ও আধুনিক প্রযুক্তির এই চমৎকার সমন্বয় মহেশপুরতলীকে আজ অন্যদের জন্য একটি অনুকরণীয় মডেল করে তুলেছে। খামারিদের জন্য সরকারিভাবে সহজ শর্তে ঋণ ও আরও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এই শিল্প ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় ও বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে।
আকাশজমিন / আরআর