খুলনা প্রতিনিধি
খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার লতা ইউনিয়নে দেশের প্রচলিত ভূমি আইন, নদী রক্ষা নীতিমালা এবং সরকারি বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করে সরকারি খাস জমি, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও অর্পিত (ভিপি) সম্পত্তি দখলপূর্বক বিলাসবহুল বাগানবাড়ি এবং বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একটি ঐতিহাসিক নদীর স্বাভাবিক গতিপথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ করে এবং বিপুল পরিমাণ সরকারি সম্পত্তি গ্রাস করার এই মহাসড়যন্ত্রের মূল হোতা হিসেবে নাম এসেছে লতা ইউনিয়নের বর্তমান ইউপি সদস্য কুমারেশ মন্ডল ও তার আপন ভাই প্রশান্ত মন্ডলের বিরুদ্ধে। স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, বিগত সরকারের আমলে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে রাজনৈতিক ক্ষমতার চরম অপব্যবহার এবং দলীয় প্রভাব খাটিয়ে এই সহোদর চক্রটি একে একে এলাকার সরকারি নানা সম্পত্তি ও নিরীহ স্থানীয়দের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি জোরপূর্বক নিজেদের কবজায় নিয়েছে। সর্বশেষ অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে কুমারেশ মন্ডল মেম্বার নির্বাচিত হওয়ার পর তাদের এই অবৈধ দখলদারিত্ব ও ভূমি গ্রাসের প্রক্রিয়া আরও বেশি বেপরোয়া ও অনিয়ন্ত্রিত রূপ ধারণ করেছে।
সরকারি গ্যাজেটের ঐতিহাসিক তথ্য ও নথিপত্র অনুযায়ী, লতা ইউনিয়নের অন্তর্গত উলুবুনিয়া নদীটির মোট আয়তন ছিল ৫৫.৮৯ একর। কিন্তু প্রভাবশালী এই চক্রের অবাধ ও ধারাবাহিক দখলদারিত্ব, একের পর এক অবৈধ বাঁধ নির্মাণ এবং চারপাশ থেকে মাটি ভরাটের কারণে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এই প্রমত্তা নদীটি এখন মৃতপ্রায় এবং প্রায় সম্পূর্ণ ভরাট হয়ে গেছে। সরজমিনে ভুক্তভোগী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, উলুবুনিয়া নদী অববাহিকার সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকার ঠিক পাশেই অবস্থিত কালভার্টের মুখের কাছাকাছি কুমারেশ ও প্রশান্ত মন্ডল তাদের বিলাসবহুল বাগানবাড়ির সুউচ্চ সীমানা প্রাচীর বা দেয়াল নির্মাণ করেছেন। এই অবৈধ দেয়ালটি নদীর বুক চিরে অপর পাড় পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে, যা নদীর পানি প্রবাহকে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। উল্লেখ্য, গত ২০১৮ এবং ২০২১ সালে এই উলুবুনিয়া নদীটির নাব্যতা ও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ সচল রাখার উদ্দেশ্যে সরকারি অর্থায়নে বড় ধরনের খনন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। তবে ক্ষমতার দাপটে এই সিন্ডিকেট নদীর মূল গতিপথকে আড়াল করে লোকদেখানো নামমাত্র খননকাজ সম্পন্ন দেখায়। পরবর্তীতে তারা নদী ভরাট করে নিজেদের বাড়ির সীমানা আরও বহুদূর প্রসারিত করে নেয়, যার ফলে নদীটি এখন মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার পথে।
অভিযুক্ত এই দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে কেবল নদী দখলই নয়, বরং বিস্তর ভূমি গ্রাস ও জালিয়াতির মারাত্মক অভিযোগ রয়েছে। তারা ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে স্থানীয় শামুকপোতা বাজারে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী মন্দির সংলগ্ন প্রধান সড়কের পাশে সরকারি আইন ও বিধিনিষেধ সম্পূর্ণ অমান্য করে একটি বহুতল বাণিজ্যিক ভবন তৈরি করেছে, যা সরকারি নিয়মানুযায়ী সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া কুমারেশ ও প্রশান্ত মন্ডল বর্তমানে যে সুবিশাল জায়গায় বিলাসবহুল বাড়ি তৈরি করে বসবাস করছেন এবং তার সামনে থাকা যে ৯ বিঘা কৃষিজমি রয়েছে—সেটি মূলত সুদীপ্ত মন্ডল নামের এক স্থানীয় ব্যক্তির নামে সরকারি বন্দোবস্ত বা ডিসিআর নেওয়া জায়গা। প্রাথমিক অবস্থায় তারা জমিটি চাষাবাদের জন্য ‘হারি’ বা লিজ হিসেবে নিলেও, সময়ের সাথে সাথে ক্ষমতার দাপটে তা সম্পূর্ণ নিজেদের স্থায়ী দখলে নিয়ে নেয়। এই প্রভাবশালী ও উগ্র চক্রের ক্ষমতার দাপট ও প্রতিশোধের ভয়ে এলাকার সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষ চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন এবং প্রকাশ্য দিবালোকে এই লুণ্ঠন দেখলেও কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
ভূমি, সরকারি ভিপি সম্পত্তি এবং জনগুরুত্বপূর্ণ নদী দখলের এসব সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত প্রশান্ত মন্ডলের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি মৌখিকভাবে দাবি করেন যে তারা সরকারি জমি যথাযথ নিয়ম মেনেই লিজ নিয়েছেন। তবে এই দাবির সপক্ষে কোনো প্রকার বৈধ কাগজপত্র, রসিদ বা আইনি নথিপত্র তিনি সংবাদমাধ্যমের সামনে দেখাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন। জমির প্রকৃত মালিকানার বৈধ নথিপত্র দেখতে চাওয়া হলে তিনি একটি অদ্ভুত অজুহাত দাঁড় করান। তিনি দাবি করেন, গত ৫ই আগস্ট দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হওয়ার পর উত্তেজিত জনতা তার বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং সেই অগ্নিকাণ্ডেই তাদের লিজের সকল বৈধ কাগজপত্র ও নথিপত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
এই ভূমি গ্রাসের বিষয়ে উপজেলা লতা ইউনিয়নের বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ইব্রাহীম গাজী এর সাথে কথা হলে তিনি ভিন্ন একটি তথ্য দেন। তিনি বলেন, "প্রশান্তরা যেখানে বাড়ি করেছে সেটা মূলত নদীর মূল জায়গা না। এই জমিটি আসলে আকবর (ওরফে) আকু মেম্বারের নামে ডিসিআর কাটা ছিল। উনার কাছ থেকে অনেক বছর আগে প্রশান্তরা লিজ বা চুক্তি নিয়ে এখানে আবাসন ও চাষাবাদ শুরু করে।" তবে এর পরপরই তিনি স্বীকার করেন যে, দেশের প্রচলিত ভূমি আইন অনুযায়ী সরকারি ডিসিআর এর জমি কোনোভাবেই অন্য কারও কাছে হস্তান্তর বা বিক্রিযোগ্য নয়। ফলে এই জমি দখল বা ব্যবহার সম্পূর্ণ অবৈধ।
এই চরম অনিয়মের বিষয়ে পাইকগাছা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফজলে রাব্বী অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, "আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। দেশের সরকারি সম্পত্তি বা জনগণের নদী দখল করার কোনো আইনি সুযোগ কারও নেই। লতা ইউনিয়নে সরকারি ভিপি সম্পত্তি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা এবং নদী অববাহিকা দখলের যে অভিযোগ উঠেছে, তা আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছি। সহকারী তথ্য সংগ্রহ ও তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কঠোর আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।"
অন্যদিকে এই চাঞ্চল্যকর বিষয়ে পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াসীউজ্জামান চৌধুরী জানান, "নদী ও সরকারি ভিপি সম্পত্তি দখলের এই সুনির্দিষ্ট বিষয়টি পূর্বে আমার জানা ছিল না। সংবাদমাধ্যমের মারফতে বিষয়টি অবগত হলাম। আমরা অত্যন্ত দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করব এবং তদন্ত সাপেক্ষে আইন অনুযায়ী দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করব।" প্রকাশ্য দিবালোকে একটি সরকারি নদীর অস্তিত্ব সংকটে ফেলে এবং রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকার ভিপি সম্পত্তি দখল করে এমন বিলাসবহুল স্থাপনা নির্মাণের ঘটনায় পাইকগাছার সাধারণ ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। এলাকার পরিবেশ রক্ষা, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে স্থানীয় এলাকাবাসী অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে এই বিশাল সম্পত্তি পুনরায় সরকারি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।