রফিকুল ইসলাম রাজু
মেথিকান্দা
রেলওয়েস্টেশন বাংলাদেশের
ঢাকা বিভাগের নরসিংদীজেলার রায়পুরাউপজেলায় অবস্থিত একটি রেলওয়েস্টেশন। সেই মেথিকান্দা রেলওয়ে স্টেশনের একটি জরাজীর্ণ বেঞ্চে বসেছিল সত্তুর বছর বয়সী এক নারী। মুখমণ্ডল
ক্ষতবিক্ষত, শরীর থেকে চুইয়ে পড়ছে তাজা রক্ত। কিন্তু তাঁর চোখে কোনো জল ছিল না,
মুখে ছিল না কোনো আর্তনাদ।
এক জোড়া নিরুত্তাপ, শূন্য দৃষ্টি মেলে তিনি তাকিয়ে ছিলেন এই সভ্য পৃথিবীর
দিকে। তাঁর এই নীরবতা কোনো
অভিমানী নীরবতা ছিল না, এটি ছিল মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তের এক চরম অসাড়তা। গত মঙ্গলবার রাতে ভোরে তিনি চিরতরে চোখ বুজেছেন। ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে, লোহার রড আর লাঠি
দিয়ে পিটিয়ে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে একদল ‘মানুষরূপী দুর্বৃত্ত’।
তাঁর
অপরাধ? ২৫ বছর ধরে
তিল তিল করে জমানো চল্লিশ হাজার টাকা তিনি সহজে ছাড়তে চাননি। যে টাকা তিনি
জমিয়েছিলেন সিকি-আধুলি হাত পেতে, স্টেশনের নোংরা প্ল্যাটফর্ম নিজের বুড়ো হাত দিয়ে পরিষ্কার করে। প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৪ টাকা ৩৮
পয়সা জমিয়ে পঁচিশ বছরে তৈরি হওয়া সেই পুজিটুকু আজ আর নেই।
ওরা টাকাগুলো লুটে নিয়েছে, আর বিনিময়ে উপহার
দিয়ে গেছে এক বৃদ্ধার রক্তাক্ত
লাশ।
সত্তুর
বছর বয়সী একজন নিঃস্ব নারীর এমনিতেও এই পৃথিবীর কাছে
নতুন করে কিছু চাওয়ার বা বলার থাকে
না। জীবনের নিষ্ঠুর কষাঘাত তাঁদের এতটাই ক্লান্ত করে রাখে যে, নতুন কোনো প্রতিবাদের ভাষা তাঁদের থাকে না। কিন্তু বুবির গল্পটা একটু বেশিই আলাদা, একটু বেশিই যন্ত্রণাদায়ক। কারণ দীর্ঘ সত্তুর বছরের জীবনে এই নারী কখনও
একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। তিনি ছিলেন জন্মগত বাক্প্রতিবন্ধী। একটি অর্থপূর্ণ সম্পূর্ণ বাক্য তো দূরের কথা,
কোনোদিন একটা ভাঙা বর্ণও তাঁর মুখ থেকে বের হয়নি।
কিন্তু
আজ মানুষের বিবেককে একটা প্রশ্ন করা খুব প্রয়োজন—টাকার জন্য যখন লোহার রড দিয়ে বুবির
ওই বৃদ্ধ হাড়গুলো ভাঙা হচ্ছিল, যখন তাঁর মাংস ছিঁড়ে রক্ত ঝরছিল, তখন যদি তিনি কথা বলতে পারতেন, তবে কাকে ডেকে চিৎকার করতেন? জীবনের শেষ মুহূর্তে ওই অবর্ণনীয় যন্ত্রণার
মাঝে কার মুখটি তাঁর মনে পড়েছিল? তিনি কি তাঁর মায়ের
কথা ভেবেছিলেন? নাকি বাবার? নাকি শেষ আশ্রয় হিসেবে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকতে চেয়েছিলেন? আমরা কেউ তা জানি না।
আমরা এমনকি এটাও জানি না যে বুবির
ধর্ম কী ছিল! মৃত্যুর
পর তাঁকে দাফন করা হবে নাকি দাহ করা হবে, সেই পরিচয়টুকু দেওয়ার ক্ষমতাও তাঁর ছিল না।
আজ
থেকে ঠিক ২৫ বছর আগে
এক কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে ট্রেনে চড়ে মেথিকান্দা স্টেশনে এসে নেমেছিলেন এক তরুণী। সেই
থেকে এই প্ল্যাটফর্মই ছিল
তাঁর ঘর, তাঁর সংসার। তিনি কোত্থেকে এসেছিলেন? কার ওপর এমন গভীর অভিমান করে ঘর ছেড়েছিলেন, যার
কারণে সিকি শতাব্দী ধরে আর কোনোদিন চেনা
ঘরে ফেরেননি? নাকি তিনি এক স্টেশন থেকে
অন্য স্টেশন, এক শহর থেকে
অন্য শহর করে আসলে নিজের জীবন থেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন?
যদি
পালানোই তাঁর নিয়তি হতো, তবে মেথিকান্দা এসে কেন তাঁর পায়ের গতি থমকে গেল? কেন তিনি আর পালালেন না?
কিসের মায়ায়, কার অপেক্ষায় তিনি এই কংক্রিটের প্ল্যাটফর্মে
২৫টি বছর কাটিয়ে দিলেন? কোনো হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনের ফেরার আশায়? নাকি আবারও কোথাও পালিয়ে যাওয়ার সুযোগের অপেক্ষায়? নাকি কেবলই এক টুকরো মৃত্যুর
অপেক্ষায়?
যে
চল্লিশ হাজার টাকা চোর-ডাকাতরা কেড়ে নিল, সেই টাকা দিয়ে বুবি কী করতেন? প্রতিদিনের
ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করে জমানো এই টাকা কি
তিনি কোনোদিন কাউকে উপহার দিতেন? নাকি ভেবেছিলেন পৃথিবীর মানচিত্রের বাইরে হারিয়ে যাওয়া কোনো এক চিলতে গ্রাম্য
জমিতে নিজের জন্য একটা ছোট্ট ঘর বানাবেন? নাকি
নিজের অবর্তমানে নিজের কবরের জায়গাটা একটু অগ্রিম বায়না করে রাখতে চেয়েছিলেন? বুবি এসব কোনো প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাননি।
মেথিকান্দা
স্টেশনে ২৫ বছর আগে
তিনি যেভাবে নীরবে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, কেউ টেরই পায়নি যে একজোড়া নতুন
পা মানুষের ভিড়ে রোজ হাঁটছে। ঠিক একইভাবে আজ তিনি নীরবে
চলে গেলেন। কিছুদিন পর এই প্ল্যাটফর্মের
ব্যস্ত মানুষগুলো ভুলেও যাবে যে একজোড়া পুরনো
ও ক্লান্ত পা আর এখানে
রোজ হাঁটছে না।
বুবির
জন্য কোনো শোকসভা হবে না, এই রাষ্ট্র বা
সমাজ বুবির হত্যার বিচার চেয়ে কোনো মিছিল করবে না। বুবির কোনো পরিচয় নেই, তাই তাঁর কবরের ওপর কোনো নামফলকও জ্বলজ্বল করবে না। বুবির না বলা কথাগুলোর
চেয়েও বেশি নীরবে আমরা সবাই ভুলে যাব যে, এই দেশের রেলওয়ে
স্টেশনগুলোতে বাস করা পরিচয়হীন মানুষদের চাইলেই যেকোনো দিন অবলীলায় পিটিয়ে মেরে ফেলা যায়। যারা স্টেশনে থাকে, তাঁরা তো মরবেই! আমাদের
কীসের দায়? আমাদের মরে যাওয়া বিবেক আজ বুবির লাশের
চেয়েও বেশি দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।