সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার রমজাননগর ইউনিয়নের টেংরাখালী এলাকায় প্রায় ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি পাকা সেতু এখন স্থানীয়দের কাছে যেন ‘খালের মাঝখানের সেতু’। নির্মাণকাজ শেষ হলেও দুই পাশে সংযোগ সড়ক (অ্যাপ্রোচ রোড) না থাকায় সেতুটি ব্যবহার করতে পারছেন না এলাকাবাসী। ফলে টেংরাখালীসহ আশপাশের পাঁচ গ্রামের হাজারো মানুষ এবং শিক্ষার্থীরা এখনও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পুরোনো একটি নড়বড়ে কাঠের সাঁকো দিয়ে চলাচল করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সেতু নির্মাণে নানা ধরনের অনিয়ম হয়েছে। সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য নির্ধারিত স্থান থেকে ভেকু দিয়ে মাটি কেটে বাইরে বিক্রি করে দিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এতে শুধু সংযোগ সড়ক নির্মাণই বাধাগ্রস্ত হয়নি, বরং আশপাশের বসতবাড়িও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অর্থায়নে টেংরাখালী গ্রামের দাউদ গাজীর বাড়ির সামনে সীমানার খালের ওপর সেতুটি নির্মাণ করা হয়। প্রায় ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় আরিফ এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় এক মাস আগে সেতুর মূল নির্মাণকাজ শেষ হলেও এখন পর্যন্ত দুই পাশে মাটি ভরাট করে সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হয়নি। ফলে সেতুতে ওঠানামার কোনো সুযোগ নেই। বাধ্য হয়ে টেংরাখালী, পার্শ্বেখালী, মিরগাং, কালিঞ্চী ও ঠাকুরঘেরী গ্রামের মানুষ আগের মতোই ঝুঁকিপূর্ণ কাঠের সাঁকো ব্যবহার করছেন।
এ অবস্থায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, বয়স্ক মানুষ, রোগী এবং নারী-শিশুরা। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করতে গিয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে বলে জানান স্থানীয়রা।
এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, সংযোগ সড়কের জন্য নির্ধারিত স্থান থেকে বিপুল পরিমাণ মাটি কেটে বাইরে বিক্রি করা হয়েছে। এতে সড়কের দুই পাশে গভীর খাদ তৈরি হয়েছে। ফলে এখন সংযোগ সড়ক নির্মাণে অতিরিক্ত মাটির প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি খাদের কারণে আশপাশের কয়েকটি বসতবাড়ি ধসে পড়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ গাজী অভিযোগ করে বলেন, “সেতু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ওঠানামার কোনো রাস্তা নেই। উল্টো ঠিকাদার মাটি কাটতে গিয়ে আমার বসতঘর খালের মধ্যে ভেঙে পড়েছে। পিআইও অফিসে বিষয়টি জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি।”
রমজাননগর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল হামিদ লাল্টু বলেন, “সংযোগ সড়ক না থাকায় মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি সত্য। আমি বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে (পিআইও) জানিয়েছি। তারা দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শ্যামনগর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মিরাজ হোসেন বলেন, “ঠিকাদারকে দ্রুত সংযোগ সড়ক নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বর্ষা ও টানা বৃষ্টির কারণে কাজ কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। বৃষ্টি কমলেই সংযোগ সড়কের কাজ শুরু করা হবে।”
তবে স্থানীয়দের দাবি, শুধু বৃষ্টিকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। সংযোগ সড়কের জন্য নির্ধারিত স্থান থেকে মাটি কেটে বিক্রি করার অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে দ্রুত সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে সেতুটি জনগণের ব্যবহারের উপযোগী করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এলাকাবাসীর মতে, জনগণের করের অর্থে নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সংযোগ সড়কের অভাবে অকেজো হয়ে পড়ে থাকায় সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।