প্রকৃতির রুদ্ররূপে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে আবারও শুরু হয়েছে চণ্ডী বর্ষণ। টানা ভারী বৃষ্টির কারণে মহানগরের অসংখ্য প্রধান সড়ক ও অলিগলিতে হাঁটুপানি জমে এক বিপর্যস্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জলাবদ্ধতার তীব্র আশঙ্কার মুখে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাময়িক পরীক্ষা ও নিয়মিত শ্রেণিকক্ষ কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।
রোববার (১২ জুলাই) সকাল ৯টা পর্যন্ত বিগত ১২ ঘণ্টার খতিয়ানে চট্টগ্রামে ১২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত নথিবদ্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে মোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩৬ দশমিক ৮ মিলিমিটার।
সকাল ১০টার দিকে নগরের চকবাজার, বাকলিয়া, রাহাত্তারপুল ও কাতালগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, সড়কগুলো যেন একেকটি মিনি খালে পরিণত হয়েছে। নোংরা ও থৈ থৈ পানি মাড়িয়েই ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে বিভিন্ন যানবাহন। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস হওয়ায় অফিসগামী ও শ্রমজীবী মানুষকে মাথায় ছাতা এবং শরীরে রেইনকোট জড়িয়ে চরম ভোগান্তির মধ্য দিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হতে দেখা গেছে। রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার তীব্র সংকট তৈরি হওয়ায় বিপাকে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা। গণপরিবহন সংকটের সুযোগ নিয়ে চালকরা স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করছেন বলে সাধারণ মানুষ অভিযোগ তুলেছেন।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম জানান, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রাবল্যের কারণে চট্টগ্রামে আগামী আরও দুই থেকে তিন দিন মুষলধারে কিংবা অতি ভারী বৃষ্টিপাতের ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। এর ফলে মহানগরের নিচু এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতা এবং পাহাড়ি অঞ্চলে মারাত্মক ভূমিধসের ঝুঁকি রয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের শনিবার বিকেলের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চট্টগ্রামের মহানগরাঞ্চলসহ ১৫টি উপজেলায় প্রায় ৬ লাখ ৬২ হাজার মানুষ বর্তমানে জলবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সাম্প্রতিক এই অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের বন্যায় পানিতে ডুবে বাঁশখালীতে ৩ জন এবং আনোয়ারা, সীতাকুণ্ড, হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও সাতকানিয়া উপজেলায় ১ জন করে প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া চট্টগ্রাম মহানগরে ২ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চট্টগ্রামে এই অবিরাম বৃষ্টি চলছে। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার জুলাই মাসের ইতিহাসে এক দিনে বিগত ৪৩ বছরের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড অলৌকিকভাবে ভেঙে যায়। সেই সময় আগ্রাবাদ, হালিশহর, চান্দগাঁও ও পতেঙ্গাসহ বিস্তীর্ণ এলাকার বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়েছিল। দুই দিন বৃষ্টি কমায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও রবিবারের নতুন বর্ষণ আবারও নতুন করে আতঙ্ক বাড়িয়েছে। সরকারি তথ্যমতে, সাতকানিয়ায় সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৫২ হাজার ৫০০ জন এবং বাঁশখালীতে প্রায় দেড় লাখ মানুষ বর্তমানে পানিবন্দি।
নগরের আমবাগান আবহাওয়া অফিসের অফিসার্স ইনচার্জ বিজন রায় জানিয়েছেন, সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত এই তিন ঘণ্টাতেই ৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এরপর ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত আরও ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় এবং তাদের হিসাব অনুযায়ী গত ২৪ ঘণ্টায় মোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১০৪ মিলিমিটার।