ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

চলনবিলে কৃষি-মৎস্যে উন্মোচিত হচ্ছে অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা


  • আপলোড সময় : রবিবার ১২ জুলাই, ২০২৬ সময় : ৫:৪৭ পিএম

রেজাউল ক‌রিম ঝন্টু ,সিরাজগঞ্জ প্রতি‌নি‌ধিঃ 

চলনবিলের কৃষি, মৎস্য ও বিকল্প অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড‌ উন্মোচন কর‌ছে নতুন সম্ভাবনার দ্বার। বাংলাদেশের বৃহত্তম ঐতিহ্যবাহী চলনবিল একসময় ছিল দেশের প্রধান শস্য ও মৎস্যভাণ্ডার হিসা‌বে প‌রি‌চিত। যা আজ তার অনেক ঐতিহ্য, নাব্যতা ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে উপনীত হয়েছে। তবে বর্তমা‌নে, নানামুখী সংকটের মধ্যেও চলনবিলের কৃষি, মৎস্য ও বিকল্প অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড‌ে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হ‌য়ে‌ছে। পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা গেলে চলনবিল বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে। জানা যায়, একসময় সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোর, নওগাঁ ও বগুড়া জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছিল চলনবিল। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ১৮২৭ সালে জনবসতি বাদে চলনবিলের জলময় অংশের আয়তন ছিল ৫০০ বর্গমাইলেরও বেশি। পরে বিভিন্ন সময়ে নদী-খালের নাব্যতা সংকট, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ফলে চলনবিলের আয়তন ক্রমাগত কমতে থাকে। ১৯০৯ সালের চলনবিল জরিপ কমিটির প্রতিবেদনে বিলের আয়তন ১৪২ বর্গমাইলে নেমে আসে। বর্তমানে প্রায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই বিলাঞ্চল বর্ষাকালে পানিতে পূর্ণ থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে পরিণত হয় বিশাল কৃষিজমিতে। বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চলনবিল অঞ্চলের বিস্তীর্ণ ভূমিতে শুরু হয় কৃষিকাজ। পৌষ ও মাঘ মাসে বোরো ধানের চারা রোপণ করা হয় এবং বৈশাখ থেকে শুরু হয় ধান কাটা। বর্তমানে চলনবিল দেশের অন্যতম বৃহৎ বোরো উৎপাদনকারী অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। ধানের পাশাপাশি এ অঞ্চলে উৎপাদিত হচ্ছে সরিষা, পাট, রসুন, পেঁয়াজ, মরিচ, আলু, গাজর, শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, পটল, লাউ, তরমুজ, বাঙ্গিসহ নানা ধরনের রবি ফসল ও শাকসবজি। উর্বর মাটি ও অনুকূল পরিবেশের কারণে প্রতিবছর এসব ফসলের উৎপাদন বাড়ছেই। ত‌বে অপরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও খাল-নদী দখলের কারণে চলনবিল তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে।

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, চলনবিলের উৎপাদিত কৃষিপণ্য স্থানীয় চাহিদাই পূরণ‌ের পাশাপা‌শি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চা‌হিদা মেটা‌তেও গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখ‌ছে। মির্জাপুর, ছাইকোলা ও মহিষলুটি হাটসহ চলনবিলের বিভিন্ন হাট থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ সবজি দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। একসময় চলনবিল ছিল দেশীয় মাছের অন্যতম প্রধান উৎস। চলনবিলের মাছের সুনাম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও পৌঁছেছিল। যদিও বর্তমানে প্রাকৃতিক মাছের উৎপাদন কমেছে, তবে বাণিজ্যিক মৎস্যচাষ নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে।

বর্তমানে চলনবিল অঞ্চলে ব্যাপকভাবে রুই, কাতলা, মৃগেল, পাঙ্গাস, তেলাপিয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ হচ্ছে। পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে কুচিয়া ও কাঁকড়া চাষ হচ্ছে, যার একটি বড় অংশ বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলনবিলে বর্তমানে ৬ হাজার ২৭৫ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন। প্রায় ১২ হাজার ২৮৪.৭৫ হেক্টর জলাভূমিতে বছরে প্রায় ৫২৩১ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হচ্ছে।

চলনবিলের মানুষ এখন শুধু কৃষি ও মাছের ওপর নির্ভরশীল নন। তারা এখন  গবাদিপশু পালন, হাঁস-মুরগি খামার, বাণিজ্যিক মৌচাষ, শামুক ও চিংড়ি চাষের মতো বিকল্প অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড‌ের সা‌খে জ‌রিত। চলন‌বি‌লে সরিষার চাষ বৃ‌দ্ধি পে‌য়ে‌ছে। আর সরিষা ফুলকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক মৌচাষ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। উৎপাদিত মধু দেশের বাজারে ব্যাপক চাহিদা পাশাপা‌শি বি‌দে‌শেও রপ্তা‌নি হ‌চ্ছে। এসব কার্যক্রম যেমন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়া‌চ্ছে তেম‌নি গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতিরও সঞ্চার করছে। 

অপরিসীম সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও চলনবিল অঞ্চল নানা সমস্যায় জর্জরিত। এ অঞ্চলের প্রধান সমস্যাগু‌লোর ম‌ধ্যে র‌য়ে‌ছে নদী ও খালের নাব্যতা হ্রাস, অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, সংরক্ষণাগারের অভাব, বিপণন ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং মৌসুমি বেকারত্ব। 


কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত হিমাগার ও সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায় না। আধুনিক সেচ ব্যবস্থা, উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি সম্প্রসারণ করা গেলে চলনবিল থেকে রেকর্ড পরিমাণ খাদ্যশস্য উৎপাদন সম্ভব হবে। পাশাপাশি কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো গেলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারবেন।

বিশেষজ্ঞদের ম‌তে, চলনবিলকে রক্ষা করতে হলে এর সঙ্গে সংযুক্ত নদী ও খালগুলোকে দখলমুক্ত করে প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ পুনরুদ্ধার করতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত মূল্যায়ন ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। চলনবিল শুধু একটি জলাভূমি নয়; এটি বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ ও গ্রামীণ অর্থনীতির এক অমূল্য সম্পদ। পরিকল্পিত ও টেকসই উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে চলনবিল দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হতে পারে।

প্রকৃতি ও উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে চলনবিলকে পুনরুজ্জীবিত করা গেলে ভবিষ্যতে এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন দুয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্টদের। 




এ সম্পর্কিত আরো খবর