ক্রীড়া ডেস্ক
ক্রিকেট মানচিত্রে ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ যেমন চিরন্তন বৈরিতার প্রতীক, আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ডের লড়াইও ঠিক তাই। এটি কেবল মাঠের ২২ জন ফুটবলারের কৌশলগত যুদ্ধ নয়; বরং এর নেপথ্যে রয়েছে রাজনৈতিক ইতিহাস, জাতীয়তাবাদ আর এক রক্তাক্ত প্রতিশোধের গল্প। দীর্ঘ ২৪ বছর পর বিশ্বমঞ্চের সেমিফাইনালে আবারও মুখোমুখি হতে যাচ্ছে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী, যা ফুটবল দুনিয়ায় এক বারুদে উত্তেজনার আবহ তৈরি করেছে।
শেষ ষোলোর ম্যাচে মিশরের বিপক্ষে রোমাঞ্চকর জয়ের পরই আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুমে বেজে উঠেছিল ইংল্যান্ড বিরোধী উস্কানিমূলক সুর। লিওনেল মেসি, এমিলিয়ানো মার্টিনেজদের সেই উদযাপনের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল বুয়েনস আইরেস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তায়। ভক্তরা মেতে উঠেছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী স্লোগানে। যদিও তখনো চূড়ান্ত ছিল না যে সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ হিসেবে ইংল্যান্ডই আসছে। অবশেষে কোয়ার্টার ফাইনালে দু’দলই নিজ নিজ ম্যাচে জয়ী হওয়ায় আগামী বুধবার আটলান্টায় ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে এই দুই পরাশক্তি।
আজ কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারানোর পর আলবিসেলেস্তে ফুটবলার ও সমর্থকেরা গ্যালারিতে সমস্বরে গেয়ে ওঠেন তাঁদের সেই চেনা স্লোগান—‘কো এল কে নো সালতা, এস উন ইংলেস’ (যে লাফাবে না, সে-ই ইংরেজ)। মাঠের লড়াইয়ের আগেই এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ প্রমাণ করে, ম্যাচটি তাঁদের কাছে কতটা মর্যাদার।
ফকল্যান্ডের রক্তক্ষয়ী ক্ষত
আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের এই ফুটবলীয় ঘৃণার মূল ভিত্তি রচিত হয়েছিল ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড (আর্জেন্টাইন নাম ‘মালভিনাস’) যুদ্ধকে কেন্দ্র করে। দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের এই দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মাত্র ৭৪ দিনের সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ব্রিটেনের সামরিক বাহিনীর হাতে আর্জেন্টিনার ৬৪৯ জন সৈনিক নিহত হন, বিপরীতে প্রাণ হারান ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা। যুদ্ধে আর্জেন্টিনার পরাজয় দেশটির মানুষের মনে যে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল, ফুটবল মাঠকে তাঁরা সেই ক্ষোভ ও প্রতিশোধের মঞ্চ হিসেবে বেছে নেয়।
ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ ও শতাব্দীর সেরা গোল
ফকল্যান্ড যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর, ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয় এই দুই দেশ। ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে আছে ডিয়েগো ম্যারাডোনার কারণে। প্রথমে হাত দিয়ে গোল করে (যা ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে পরিচিত) ইংলিশদের বোকা বানান তিনি। এর ঠিক চার মিনিট পর মাঝমাঠ থেকে একাই ড্রিবলিং করে ইংলিশ রক্ষণভাগ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে উপহার দেন ‘শতাব্দীর সেরা গোল’। আর্জেন্টিনাকে ২-১ ব্যবধানে জেতানোর পর ম্যারাডোনা অকপটে স্বীকার করেছিলেন, এই জয়টি ছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধে নিহত আর্জেন্টাইনদের জন্য এক ধরনের ফুটবলীয় প্রতিশোধ। নিজের আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি ফকল্যান্ডের কথা ভাবতে ভাবতেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেছিলাম।’
১৯৬৬ সালের ‘পশু’ বিতর্ক
১৯৮২ সালের যুদ্ধের আগেও ফুটবলের মাঠে এই দুই দলের তিক্ততার একটা কুৎসিত ইতিহাস ছিল। ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল এই দুই দল। সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাতিনকে অত্যন্ত বিতর্কিতভাবে লাল কার্ড দেওয়া হয়। রাতিন মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে মাঠে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের তৎকালীন কোচ আলফ রামসে তাঁর খেলোয়াড়দের নির্দেশ দেন আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের সাথে জার্সি বদল না করতে এবং আর্জেন্টাইনদের প্রকাশ্যে ‘পশু’ বলে গালি দেন। এই মন্তব্যকে আর্জেন্টাইনরা বর্ণবাদী ও চরম অপমানজনক হিসেবে দেখে, যা দুই দেশের ফুটবলীয় ঘৃণাকে আজীবনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
ম্যারাডোনার উত্তরাধিকার এবার মেসির কাঁধে
আশ্চর্যের বিষয় হলো, লিওনেল মেসি তাঁর দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে অফিশিয়াল বা প্রীতি ম্যাচ মিলিয়ে কখনোই ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হননি। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপের এই সেমিফাইনালটি মেসির জন্য যেমন প্রথম, আর্জেন্টিনার সাধারণ মানুষের কাছেও এটি ম্যারাডোনার সেই ১৯৮৬ সালের উত্তরাধিকার ধরে রাখার এবং ব্রিটিশদের আরও একবার স্তব্ধ করার এক সুবর্ণ সুযোগ। আর এই কারণেই মাঠের লড়াই শুরুর আগেই আর্জেন্টিনা শিবির এতটা তেঁতে আছে।
উত্তেজনার পারদ এতটাই উঁচুতে থাকে যে, রেফারি নিয়োগের ক্ষেত্রেও দুই দলের ম্যাচ ঘিরে ফিফার অলীখিত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আর্জেন্টিনার ম্যাচে সাধারণত ফিফা ইংলিশ রেফারি নিয়োগ দেয় না। তেমনি ইংল্যান্ডের ম্যাচেও আর্জেন্টাইন রেফারি দায়িত্বে থাকে না।
বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা দ্বৈরথের পরিসংখ্যান
বিশ্বকাপের মঞ্চে এখন পর্যন্ত ৫ বার মুখোমুখি হয়েছে এই দুই পরাশক্তি। ১৯৬২ সালের প্রথম দেখায় এবং ১৯৬৬ সালে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছিল ইংল্যান্ড। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার জাদুতে জিতেছিল আর্জেন্টিনা। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে ডেভিড বেকহ্যাম লাল কার্ড দেখার পর টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেয় ইংল্যান্ড। তবে চার বছর পর (২০০২) গ্রুপ পর্বে বেকহ্যামের পেনাল্টি গোলেই ১-০ ব্যবধানে জিতে মধুর প্রতিশোধ নেয় ইংলিশরা। ২০০৫ সালের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলে এই দুই দল আর কোৃনো ম্যাচে মুখোমুখি হয়নি, যা এবার দীর্ঘ ২১ বছর পর ভাঙতে যাচ্ছে।