মুন্সীগঞ্জ জেলাজুড়ে সক্রিয় থাকা একটি বড় ধরণের আন্তঃজেলা মোটরসাইকেল চোরচক্রের আস্তানায় হানা দিয়েছে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশ। নিখুঁত ও সাঁড়াশি এই অভিযানে চোরচক্রের তিন প্রধান সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সেই সাথে তাদের হেফাজত থেকে একটি নামী ব্র্যান্ডের সুজুকি মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন মডেলের আরও চারটি চোরাই মোটরবাইক উদ্ধার করা হয়েছে। সোমবার (১৩ জুলাই) সকালে পদ্মা সেতুর উত্তর থানা চত্বরে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জেলার পুলিশ সুপার মো. মেনহাজুল আলম এই সাফল্যের বিবরণ তুলে ধরেন।
পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরা হলেন— নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নিতাইগঞ্জ বাপ্পী চত্বর এলাকার বাসিন্দা মো. সুমন (২৫), মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার দক্ষিণ বেতকা গ্রামের হৃদয় দেওয়ান (৩০) এবং একই উপজেলার আমতলী এলাকার বাসিন্দা সজীব পাইক (২৪)। সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার জানান, চুরির ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ৯ জুলাই। ওই দিন পদ্মা সেতু (উত্তর) থানার অন্তর্গত পশ্চিম কুমারভোগ এলাকা থেকে শরীয়তপুর জেলার বাসিন্দা মো. সজিবের একটি শখের মোটরবাইক চুরি হয়ে যায়। এই ঘটনায় থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়েরের পর তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় জেলা ডিবি পুলিশকে। গোয়েন্দা পুলিশ আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি এবং মাঠপর্যায়ের গোপন সংবাদের ওপর ভিত্তি করে গত ১২ জুলাই গভীর রাতে প্রতিবেশী জেলা নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালায়। সেখান থেকে চোরচক্রের অন্যতম হোতা মো. সুমনকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তার কাছ থেকেই শরীয়তপুরের সজিবের চুরি যাওয়া সুজুকি মোটরসাইকেলটি অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
পরবর্তীতে ধৃত সুমনের দেওয়া চাঞ্চল্যকর ও স্বীকারোক্তিমূলক তথ্যের ভিত্তিতে ডিবি পুলিশের বিশেষ দলটি মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ীর বেতকা বাজার এলাকায় দ্বিতীয় দফায় অভিযান চালায়। সেখান থেকে চক্রের আরেক সদস্য হৃদয় দেওয়ানকে গ্রেপ্তার করাসহ একটি নম্বরপ্লেটহীন বা রেজিস্ট্রেশনবিহীন ১২৫ সিসির ডিসকভার মোটরবাইক জব্দ করা হয়। এরপর হৃদয়ের দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী আমতলী এলাকায় অভিযান চালিয়ে সজীব পাইককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এই সময় সজীবের কাছ থেকে একটি হাঙ্ক ১৫০ সিসির মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়, যা চোরাই বাইক বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, চক্রটির জাল কতদূর বিস্তৃত তা নিশ্চিত হতে গোয়েন্দারা লৌহজং উপজেলার গোয়ালীমান্দ্রা এলাকায় গভীর রাতে আরেকটি অভিযান চালিয়ে আরও দুটি নম্বরপ্লেটবিহীন পালসার মোটরসাইকেল উদ্ধার করতে সক্ষম হন। উদ্ধার হওয়া এই শেষ দুটি বাইকের ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বর অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ঘষামাজা করা ছিল, যাতে কেউ এগুলো সহজে শনাক্ত করতে না পারে।
ডিবি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, এই চক্রের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে মুন্সীগঞ্জ, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলায় সুকৌশলে মোটরবাইক চুরি করে আসছিল। এরপর চুরিকৃত বাইকগুলোর নম্বরপ্লেট ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ পরিবর্তনের মাধ্যমে ভুয়া কাগজ তৈরি করে সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করত।
এদিকে, একই গোয়েন্দা অভিযানের অংশ হিসেবে লৌহজং উপজেলার গোয়ালীমান্দ্রা এলাকার একটি দর্জি দোকানে তল্লাশি চালায় ডিবি পুলিশ। সেখান থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১ হাজার ১০০ পিস অবৈধ ইয়াবা ট্যাবলেট ও ২ কেজি গাঁজা জব্দ করা হয়। এই মাদক কারবারের সাথে জড়িত থাকার অপরাধে আলাল ওরফে আলা উদ্দিন নামের এক স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীকে আসামি করে নতুন মামলা দায়ের করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত তিন বাইক চোরের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানায় চুরির নিয়মিত মামলাসহ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণ করে আদালতে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে বলে নিশ্চিত করেছেন পুলিশ সুপার।