ক্রীড়া ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ফুটবলের মহোৎসব ও শ্রেষ্ঠত্বের আসর বিশ্বকাপ ফুটবলকে আরও বিশাল ও বিস্তৃত পরিসরে রূপ দেওয়ার এক নতুন এবং বৈপ্লবিক আলোচনা শুরু হয়েছে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে। সদ্য সমাপ্ত হওয়া ফুটবল বিশ্বকাপের মেগা আসর শেষ হওয়ার পরপরই টুর্নামেন্টটিতে অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা ৪৮ থেকে বাড়িয়ে ৬৪ দলে উন্নীত করার জোরালো সম্ভাবনা নিয়ে আইনি মূল্যায়ন ও আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনার আভাস দিয়েছেন বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ফিফা প্রধানের সুনির্দিষ্ট দর্শন অনুযায়ী, বিশ্বকাপ ফুটবল এমন একটি সর্বজনীন বৈশ্বিক মঞ্চ হওয়া উচিত, যেখানে পৃথিবীর প্রতিটি ছোট-বড় দেশেরই অন্তত একবার অংশ নেওয়ার ও খেলার স্বপ্ন দেখার বাস্তবসম্মত সুযোগ থাকা উচিত। সুইজারল্যান্ডের জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যম ‘ব্লু স্পোর্ট’কে দেওয়া এক একান্ত ও এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে ইনফান্তিনো স্পষ্ট করে বলেন যে, যখন কোনো ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজন বা এর কাঠামোগত সংস্কার করা হয়, তখন কেবল ইউরোপ বা দক্ষিণ আমেরিকার মতো ঐতিহ্যবাহী ফুটবল পরাশক্তি অঞ্চলের কথা ভাবলে চলবে না, কারণ ফুটবল পুরো বিশ্বের সম্পদ। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, প্রতিটি দেশেরই বিশ্বমঞ্চে খেলার স্বপ্ন দেখার অধিকার রয়েছে।
ফিফা সভাপতি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান বাস্তবতায় বিশ্বের বিভিন্ন অনুন্নত ও উন্নয়নশীল অঞ্চলের ফুটবল দলগুলোর মান আগের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তারা প্রতিনিয়ত নিজেদের খেলার উন্নতি সাধন করছে। যদি এই উঠতি ছোট দেশগুলোকে ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে খেলার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া না হয়, তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাদের নিজেদের আরও উন্নত করার যে স্বাভাবিক অনুপ্রেরণা, তা এক সময় সম্পূর্ণ হারিয়ে যাবে। তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল নিয়ে আয়োজিত এবারের মেগা বিশ্বকাপ মাঠের লড়াই ও বাণিজ্যের দিক থেকে দারুণভাবে সফল ও ফলপ্রসূ হয়েছে।
যেমন এই আসরে আফ্রিকা মহাদেশের ১০টি দেশের মধ্যে রেকর্ড ৯টি দেশই গ্রুপ পর্বের বৈতরণী পার হয়ে নকআউট পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে, যেখানে বিগত কাতার বিশ্বকাপে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ থেকে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল মাত্র ৫টি দেশ। উল্লেখ্য, বিশ্ব ফুটবলের গভর্নিং বডি ফিফা গত ২০১৭ সালে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৪৮ করার বিল পাস করেছিল। এরপর ২০২৫ সালের এপ্রিলে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল সংস্থা (কনমেবল) ২০৩০ সালের শতবর্ষী আসর থেকেই বিশ্বকাপ ৬৪ দল নিয়ে আয়োজনের একটি আনুষ্ঠানিক ও লিখিত প্রস্তাব ফিফার সদর দপ্তরে পেশ করে। তবে এই বিপুল স্পর্শকাতর বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত বা প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি।
ভবিষ্যতের ২০৩০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের মূল ও যৌথ আয়োজক হিসেবে রয়েছে তিনটি দেশ— স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কো। তবে ফুটবল বিশ্বকাপের গৌরবময় শতবর্ষ উদযাপনের বিশেষ অংশ হিসেবে টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী তিনটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে লাতিন আমেরিকার তিন দেশ আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়েতে। কারণ ১৯৩০ সালের ইতিহাসের প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপের একক আয়োজক ও চ্যাম্পিয়ন ছিল উরুগুয়ে। তবে বিশ্বমঞ্চে ৬৪টি দেশের এই বিশাল সমাগম ও সম্প্রসারণের প্রস্তাবের পক্ষে সবাই সায় দিচ্ছেন না, বরং ফুটবল বিশ্বের একটি বড় অংশ এই ধারণার তীব্র বিরোধিতা শুরু করেছে। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার (উয়েফা) সভাপতি আলেক্সান্দার সেফেরিন এই প্রস্তাবের কড়া সমালোচনা করে একে একটি অত্যন্ত ‘বাজে ধারণা’ বলে সরাসরি মন্তব্য করেছেন। একই সুরে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফা মনে করেন যে, বিশ্বকাপে আরও দল বাড়ানো হলে তা মূল প্রতিযোগিতার গুণগত মান নষ্ট করবে এবং টুর্নামেন্টে বড় ধরনের ‘বিৃঙ্খলা’র সৃষ্টি করতে পারে। এ ছাড়া উত্তর, মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবল সংস্থার (কনকাকাফ) সভাপতি ভিক্টর মন্টাগ্লিয়ানি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, ৬৪ দলের মেগা বিশ্বকাপ ফুটবলের সার্বিক আন্তর্জাতিক সূচি ও সামগ্রিক কাঠামোর জন্য অত্যন্ত ‘ক্ষতিকর’ প্রমাণিত হতে পারে।
এর বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসের বিশ্বকাপ টাস্কফোর্সের নির্বাহী পরিচালক অ্যান্ড্রু জুলিয়ানি এক চমকপ্রদ বিবৃতিতে বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র আগামী ২০৩৮ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের একক আয়োজক হতে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিড করার পরিকল্পনা করছে এবং বিশ্বমঞ্চে টুর্নামেন্টটি যদি ৬৪ দলেরও করা হয়, তবে তা সফল ও নিখুঁতভাবে আয়োজন করার মতো বিশাল অবকাঠামো ও সামর্থ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। তবে ফিফার বর্তমান অফিশিয়াল অবস্থান হলো, সদস্য দেশগুলোর যেকোনো প্রস্তাব তারা গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করবে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসবে, তবে এখনই ৬৪ দলের বিশ্বকাপ চালুর কোনো তাড়াহুড়ো বা সুনির্দিষ্ট ইঙ্গিত নেই এবং এর চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারণ করবে ফিফা কাউন্সিল।