ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৭ ঘরই তালাবদ্ধ: বঞ্চিত প্রকৃত ভূমিহীনরা


  • আপলোড সময় : সোমবার ১৩ জুলাই, ২০২৬ সময় : ৭:২৮ পিএম

মুহ. মিজানুর রহমান বাদল, মানিকগঞ্জ

দেশের প্রান্তিক ও চরম অবহেলিত ভূমিহীন ও গৃহহীন অসহায় মানুষের মাথা গোঁজার নিজস্ব ঠাঁই নিশ্চিত করার মহৎ লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল আশ্রয়ণ প্রকল্প। কিন্তু মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া উপজেলার বরাইদ ইউনিয়নের খলিশাডহুরা এলাকায় প্রশাসনের চরম উদাসীনতা ও ত্রুটিপূর্ণ বরাদ্দ প্রক্রিয়ার কারণে সেই সরকারি স্বপ্নের প্রকল্পের মোট ১৭টি ঘরের প্রতিটিই বছরের পর বছর ধরে সম্পূর্ণ তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। প্রত্যন্ত এই জনপদে নির্মিত সরকারি ঘরগুলোতে সুফলভোগীদের বসবাস তো দূরের কথা, সঠিক দেখভাল ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঘরগুলোর চারপাশ এখন ঘন জঙ্গল ও আগাছায় ছেয়ে গেছে এবং বারান্দাগুলো আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে, একই এলাকার শত শত প্রকৃত ভূমিহীন, অসহায় ও ছিন্নমূল পরিবার মাথার ওপর একটি পাকা ছাদের আশায় চরম মানবেতর জীবনযাপন করলেও তাদের কপালে জোটেনি কোনো সরকারি ঘর। সাটুরিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) প্রধান কার্যালয়ের দাপ্তরিক নথি ও সূত্র থেকে জানা গেছে, বিগত ২০২০-২১ অর্থবছরে মুজিববর্ষ উদযাপনের বিশেষ উপহার হিসেবে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের অধীনে খলিশাডহুরা এলাকায় এই ১৭টি ঘর অত্যন্ত যত্ন সহকারে নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রতিটি সরকারি ঘরে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ দুটি শয়নকক্ষ, একটি রান্নাঘর ও একটি করে টয়লেট রাখা হয়েছে। তৎকালীন সময়ে প্রতিটি ঘর নির্মাণে সরকারি কোষাগার থেকে ব্যয় হয়েছিল ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা। নির্মাণ কাজ নিখুঁতভাবে শেষ হওয়ার পরপরই ঘরগুলোর চাবি ও মালিকানা দলিল উপকারভোগীদের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হলেও রহস্যজনক কারণে আজ পর্যন্ত কোনো উপকারভোগী পরিবার সেখানে গিয়ে একটি দিনের জন্যও বসবাস করেননি।

সরেজমিনে খলিশাডহুরা এলাকার ওই আশ্রয়ণ প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, প্রকল্পের সারি সারি ১৭টি ঘরের প্রতিটির মূল ফটকেই ঝুলছে বড় বড় তালা। পুরো প্রকল্প এলাকাটি বিশাল আগাছা, পরজীবী লতাগুল্ম ও ঝোপঝাড়ে সম্পূর্ণ ঢেকে গিয়ে এক ভুতুড়ে পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে কোনো মানুষ না থাকায় এবং দেখভালের অভাবে কয়েকটি ঘরের দেওয়ালে ইতিমধ্যেই বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। ঘরগুলোর বারান্দায় স্থানীয় প্রভাবশালীরা অবৈধভাবে তাদের ট্রাক্টর, মাটি, গোবর, খড় ও ভুট্টার গাছসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য ও মালামাল স্তূপ করে রেখে দিয়েছেন। উপযুক্ত তদারকির অভাবে রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে নির্মিত এই দৃষ্টিনন্দন ঘরগুলো ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত ও ভাঙাচোরা স্থাপনায় পরিণত হতে চলেছে। স্থানীয় সচেতন বাসিন্দাদের গুরুতর অভিযোগ, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যথাযথ যাচাই-বাছাই ও মাঠপর্যায়ে সঠিক তদন্ত না করেই সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবে দূরের অন্য এলাকার বিত্তবান ব্যক্তিদের নামে এসব ঘর অন্যায়ভাবে বরাদ্দ দেওয়ায় আজ এই চরম সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। যাদের নামে এই মূল্যবান সরকারি ঘরগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তাদের সিংহভাগই এই প্রকল্প এলাকা থেকে প্রায় ১২ থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরের বালিয়াটি, হাজীপুর ও খলিলাবাদ গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা। নিজেদের মূল কর্মস্থল, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নিজস্ব বসতভিটা সেই দূরবর্তী অঞ্চলে হওয়ায় তারা খলিশাডহুরা গ্রামে এসে থাকার কোনো প্রয়োজনই মনে করছেন না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বরাদ্দ পাওয়া কয়েকজন ব্যক্তি স্বীকার করেছেন যে, তাদের মূল জীবিকা ও ব্যবসা বালিয়াটি বাজার কেন্দ্রিক হওয়ায় প্রতিদিন এত দূর থেকে যাতায়াত করে এই প্রত্যন্ত গ্রামীণ প্রকল্পে বসবাস করা তাদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়; তাই তারা সরকারি ঘর বুঝে নিলেও কখনো সেখানে ওঠার কথা ভাবেননি। এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা আরও অভিযোগ করেছেন যে, ভবিষ্যতে সরকারি জমি ও পাকা ঘরটি চড়া দামে গোপনে বিক্রি করার অসৎ উদ্দেশ্যে অনেকেই বিভিন্ন তদবিরের মাধ্যমে এই বরাদ্দ বাগিয়ে নিয়েছিলেন, কিন্তু আইনগত জটিলতায় বিক্রি করতে না পেরে ঘরগুলো এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রেখেছেন। খলিশাডহুরা গ্রামের গৃহবধূ শাহানাজ বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মানুষ না থাকায় সরকারি ঘরগুলোর বারান্দায় এলাকার লোকজন গোবর আর ভুট্টার খড়ি রাখছে, অযত্নে লাখ লাখ টাকার ঘরগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।” স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. রমজান আলী হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “আমার এই বুকেই অনেক প্রকৃত ভূমিহীন অসহায় পরিবার কুঁড়েঘরে দিন কাটাচ্ছে। তাদের নামে এই তালাবদ্ধ ঘরগুলো পুনরায় বরাদ্দ দেওয়ার জন্য আমি একাধিকবার সাটুরিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন জমা দিয়েছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত ওপর মহল থেকে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।”

এই প্রকাশ্য অনিয়ম ও অপচয়ের বিষয়ে সাটুরিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা খলিলুর রহমান মোল্লা ঘটনা সত্যতা স্বীকার করে বলেন, “আমি নিজেই প্রকল্পটি সশরীরে পরিদর্শন করে দেখেছি যে, ১৭টি ঘরের সবগুলোই দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ এবং সেখানে কোনো উপকারভোগী পরিবার থাকেন না।” এই বিষয়ে সাটুরিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী মোহাম্মদ অনিক ইসলাম তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ঢাকাটুডেকে জানান, “যারা সরকারের দেওয়া উপহারের ঘর পেয়েও সেখানে বসবাস না করে ফেলে রেখেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছি। খুব দ্রুত তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে। যেহেতু তাদের নামে জমির রেজিস্ট্রি দলিল সম্পন্ন হয়ে গেছে, তাই প্রচলিত আইনি ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই তাদের বরাদ্দ বাতিল করে এলাকার প্রকৃত ভূমিহীনদের মাঝে এই ১৭টি ঘর নতুন করে বণ্টন করা হবে।”

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর