ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

ম্যারাডোনার শেখানো সেই জাদুকরী গোল-কৌশলের অপেক্ষায় হ্যারি কেইন


  • আপলোড সময় : বুধবার ১৫ জুলাই, ২০২৬ সময় : ৮:৪২ পিএম

২০১৭ সালের ২২ অক্টোবর। তখনকার সময়ে টটেনহাম হটস্পারের অস্থায়ী হোম ভেন্যু ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচে লিভারপুলের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল তারা। কিন্তু মাঠের লড়াই শুরুর ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে টটেনহামের সাজঘরে এক অভাবনীয় রোমাঞ্চ দানা বাঁধতে শুরু করে। ক্লাবের কর্মকর্তাদের সূত্রে খেলোয়াড়েরা জানতে পারেন, আজ গ্যালারিতে বসে খেলা দেখবেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রঙিন, রাজকীয় ও বোহেমিয়ান বরপুত্র ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা। ফিফার বর্ষসেরা পুরস্কারের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সে সময় লন্ডনে অবস্থান করছিলেন আর্জেন্টিনার এই মহানায়ক। টটেনহামের আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি ও ক্লাবের বিশেষ দূত ওসি আর্দিলেস এই সুযোগটি হাতছাড়া করতে চাননি। তিনি ম্যারাডোনাকে আমন্ত্রণ জানান টটেনহামের ডাগআউটে থাকা তাঁরই একসময়ের অনুজ এবং নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের সাবেক রুমমেট মরিসিও পচেত্তিনোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে।

ফুটবল ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, ১৯৯৩ সালে নিউয়েলস ওল্ড বয়েজে যখন ডিয়েগো ম্যারাডোনার খেলোয়াড়ি জীবনের শেষ অধ্যায় লেখা হচ্ছিল, ঠিক তখনই পচেত্তিনোর ক্যারিয়ারের সূচনা পর্ব চলছিল। ক্লাবটিতে যোগ দেওয়ার পর পচেত্তিনো যখন অত্যন্ত লাজুকভাবে নিজের পরিচয় দিতে ম্যারাডোনার কাছে গিয়েছিলেন, তখন ফুটবল ঈশ্বর হেসে উঠে বলেছিলেন, ‘আমি খুব ভালো করেই জানি তুমি কে!’ কী এক জাদুকরী মুহূর্ত ছিল সেটি! পরবর্তী সময়ে পচেত্তিনো যখন টটেনহামের কোচের দায়িত্ব নেন, তখনও ম্যারাডোনা তাঁকে নিয়মিত হোয়াটসঅ্যাপে ভয়েস নোট পাঠাতেন। আর সেই অডিও বার্তাগুলো পচেত্তিনো তাঁর ক্লাবের সহকর্মীদের পরম গর্বে শোনাতেন। ম্যারাডোনাকে নিয়ে পচেত্তিনোর সেই মুগ্ধতা ও শ্রদ্ধা কখনোই ম্লান হয়নি।

স্মৃতির সরণি বেয়ে ডিয়েগো ম্যারাডোনা যখন পচেত্তিনোর কোচের রুমে পা রাখলেন, তখন টটেনহাম কোচের চোখে ছিল এক শিশুর মতো অপার বিস্ময়। পুরোনো দিনের সুখ-দুঃখের স্মৃতিচারণ শেষে পচেত্তিনো হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ডিয়েগো, তুমি কি আমার দলের অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়কের সঙ্গে দেখা করতে চাও?’ ম্যারাডোনা সানন্দে রাজি হয়ে যান। তবে ম্যাচের ঠিক আগে পুরো দলের একাগ্রতা নষ্ট করতে চাননি বলে তিনি ড্রেসিংরুমে যাননি। পরিবর্তে পেছনের দরজা দিয়ে ডেকে আনা হলো টটেনহামের তৎকালীন অধিনায়ক হুগো লরিস এবং সহ-অধিনায়ক হ্যারি কেইনকে। ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দী হওয়া সেই মুহূর্তটি ছিল সত্যি অসাধারণ। মাত্র চব্বিশ বছর বয়সী তরুণ হ্যারি কেইন কিছুটা নার্ভাস ও আড়ষ্ট হয়ে পড়েছিলেন। চোখের সামনে হঠাৎ ফুটবল ঈশ্বরকে দেখে যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। ম্যারাডোনা হাসিমুখে দুজনকে জড়িয়ে ধরলেন এবং কেইনের দিকে তাকিয়ে তাঁর চোখ দুটি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। চিরচেনা ল্যাটিন টানে চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘গলেয়াদর!’

পচেত্তিনো দ্রুত ওসি আর্দিলেসকে বললেন ম্যারাডোনার কথাগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিতে। ম্যারাডোনা রসিকতা করে লরিস ও কেইনকে নির্দেশ করে বললেন, ‘তাহলে ওরাই এই দলের মেরুদণ্ড! ও গোল বাঁচায়, আর ও গোল করে।’ কথা শেষে বিদায় নেওয়ার মুহূর্তে ঘটল সেই বিখ্যাত ঘটনা। ম্যারাডোনা হ্যারি কেইনের ডান হাতটি নিজের বাম হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে বললেন, ‘সব গোল গোলপোস্টের ওদিকে অর্থাৎ দূরের পোস্টে মেরো না। কিছু গোল এদিকে কাছের পোস্টে করার চেষ্টা করো।’ নিজের হাত বাতাসে ঘুরিয়ে বলের কাল্পনিক গতিপথ এঁকে ম্যারাডোনা মুখ দিয়ে এক অদ্ভুত আওয়াজ করে বললেন, ‘আর ব্যস, গোল!’ ম্যারাডোনা কেইনের চোখে চোখ রেখে উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন। এরপর চোখ টিপে ইশারায় বললেন, ‘কারণ প্রতিপক্ষের গোলকিপাররা আজকাল টেলিভিশনে তোমার শটের ধরন মনোযোগ দিয়ে বিশ্লেষণ করে। তারা খুব ভালো করেই জানে তুমি কোন কোণ দিয়ে বল জালে জড়াবে। তাই তাদের সাথে একটু চালাকি করো। জাস্ট ডু ইট লাইক দিস... টাক!’

সেই অক্টোবরের বিকেলে ওয়েম্বলিতে লিভারপুলের জালে দুটি গোল করেছিলেন হ্যারি কেইন। টটেনহাম জিতেছিল ৪-১ ব্যবধানে। তবে সেদিন ম্যারাডোনার শেখানো সেই ‘টাক’ কিংবা ‘পাম’-এর কৌশল কেইনকে দেখাতে হয়নি, কারণ দুটি গোলই তিনি করেছিলেন দূরের পোস্টে। ২০২০ সালের এক বিষাদময় নভেম্বরের দিনে কোটি ভক্তকে কাঁদিয়ে ম্যারাডোনা চলে গেছেন না-ফেরার দেশে। তবে ম্যারাডোনার রেখে যাওয়া সেই অমূল্য পরামর্শ আজও হয়তো হ্যারি কেইনের অবচেতনে গেঁথে রয়েছে।

আজ রাতে বিশ্বমঞ্চের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ম্যারাডোনার দেশ আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে হ্যারি কেইনের ইংল্যান্ড। যে দেশের আকাশ-বাতাস আজও ম্যারাডোনার স্মৃতিতে ভারী, যাদের রক্ষণভাগ ভেঙে আজ গোল করতে মরিয়া হয়ে উঠবেন কেইন, সেই দেশেরই ফুটবল জাদুকর একদা তাঁকে গোল করার মহৌষধ শিখিয়েছিলেন। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, আর্জেন্টিনার ডিফেন্স লাইনের সেন্টারব্যাকদের পেছনের ফাঁকা জায়গা কেইনের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। কেইন কি আজ গোলপোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে ম্যারাডোনার সেই ছলাকলা দেখাবেন? যখন গোলকিপার ধরে নেবে বল যাবে দূরের পোস্টে, তখনই কি কেইন ‘টাক’ করে বলটি কাছের পোস্টে জড়িয়ে দেবেন? যদি তিনি তা করেন, তবে সেটি হবে ফুটবল ঈশ্বরের এক চমৎকার প্রতিধ্বনি, যিনি অনেক আগেই কেইনের কানে গোল করার চিরন্তন মন্ত্র ফিসফিস করে বলে গিয়েছিলেন।


এ সম্পর্কিত আরো খবর