ফুটবলকে প্রায়শই বলা হয় অনিশ্চয়তার খেলা। কিন্তু কখনো কখনো এই অনিশ্চয়তা এমন কিছু রূপকথার জন্ম দেয়, যা মানুষের কল্পনাকেও হার মানায়। তেমনই এক রূপকথার দৃশ্যপটের সাক্ষী বিশ্ব ফুটবল।
একদিকে লিওনেল মেসি—আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী, বিশ্বজয়ী মহাতারকা, যাকে সর্বকালের অন্যতম সেরা মানা হয়। অন্যদিকে লামিনে ইয়ামাল—স্প্যানিশ ফুটবলের নতুন বিস্ময় বালক, যিনি বয়সের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়ে বিশ্বমঞ্চে নিজের রাজত্ব ঘোষণা করেছেন।
আজকের দিনে এই দুই ফুটবল জাদুকরকে একই ফ্রেমে বন্দি দেখা এক অবিশ্বাস্য রোমাঞ্চের জন্ম দেয়। ২০০৭ সালের একটি সাধারণ দাতব্য শুটের ছবি আজ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে মূল্যবান ও প্রতীকী দলিল। পাঁচ মাসের এক কোলের শিশুকে বাথটাবে গোসল করাচ্ছেন ২০ বছরের এক লাজুক তরুণ—এই ছবির পেছনের গল্প যেমন নাটকীয়, তেমনই রোমাঞ্চকর এই দুই অতিমানবের ফুটবলীয় উত্থানের ইতিহাস।
ছবির নেপথ্য নায়ক ও সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত
২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাস। বার্সেলোনা ফাউন্ডেশন এবং স্প্যানিশ গণমাধ্যম ‘দিয়ারিও স্পোর্ট’ একটি যৌথ উদ্যোগ হাতে নেয়। ইউনিসেফের তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে প্রতি বছরের মতো সেবারও বার্সেলোনার ফুটবলারদের নিয়ে একটি বিশেষ দাতব্য ক্যালেন্ডার তৈরির পরিকল্পনা করা হয়। এই ফটোশুটের দায়িত্ব পান স্প্যানিশ পেশাদার আলোকচিত্রী জোয়ান মনফোর্ট।
ক্যালেন্ডারের মডেল হিসেবে খেলোয়াড়দের একটি তালিকা তৈরি করা হয়, যেখানে ছিলেন তৎকালীন বার্সার উদীয়মান তারকা লিওনেল মেসি। অন্যদিকে, বার্সেলোনা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের মাতারো শহর থেকে কোলের শিশুকে নিয়ে ক্যাম্প ন্যুর ড্রেসিংরুমে হাজির হন এক মা। তিনি শিলা এবানা, আর তাঁর কোলের সেই ৫ মাস বয়সী শিশুটিই আজকের লামিনে ইয়ামাল।
মনফোর্ট পরবর্তীতে এই শুটের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে জানান, কাজটি করা কতটা কঠিন ছিল:
আমাদের মাত্র ১২ জন খেলোয়াড়ের তালিকা দেওয়া হয়েছিল। সাধারণত ফুটবলাররা খুব ব্যস্ত থাকেন, তারা এসে বলেন, 'তাড়াতাড়ি শেষ করুন, আমার তাড়া আছে।' কিন্তু ভালো ছবির জন্য তো সময় দিতে হয়। তার ওপর একজন ২০ বছরের লাজুক তরুণ এবং অন্যজন একটি কোলের শিশু—দুজনের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি করা ছিল রীতিমতো রক্ত পানি করার মতো কাজ।"
ইয়ামালের মা শিলা এবানার উপস্থিতিই সেদিন ছবিটিকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। তাঁর সহযোগিতায় শিশু ইয়ামাল শান্ত থাকে এবং মেসির সঙ্গে একটি মিষ্টি ও স্বতঃস্ফূর্ত মুহূর্ত তৈরি হয়। বাথটাবে থাকা ইয়ামালকে মেসি পরম মমতায় তোয়ালে জড়িয়ে কোলে তুলে নেন। ফটোশুট শেষে মনফোর্ট কৃতজ্ঞতাস্বরূপ প্রতিটি পরিবারকে ছবির একটি করে কপি উপহার দেন। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে সেই ছবিটি ইয়ামালের পারিবারিক অ্যালবামে বন্দি ছিল। অবশেষে ২০২৪ সালের ইউরো চলাকালীন ইয়ামালের বাবা মুনির নাসরাউই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিটি প্রকাশ করলে মুহূর্তেই তা বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে।
জোয়ান মনফোর্টের মতে, এটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে সেরা ছবি। তিনি এটিকে তুলনা করেন ১৯৮৬ সালের সেই ঐতিহাসিক ছবির সঙ্গে, যেখানে ১৫ বছরের বল বয় পেপ গুয়ার্দিওলা করতালির মাধ্যমে তখনকার কোচ টেরি ভেনাবলসের বিদায়কে সম্মান জানাচ্ছিলেন।
লিওনেল মেসি: লা মাসিয়ার লাজুক বালক থেকে বিশ্বজয়ী জাদুকর
২০০৭ সালের সেই ফটোশুটের সময় লিওনেল মেসি ছিলেন এক উদীয়মান প্রতিভা। বার্সেলোনার ড্রেসিংরুমে তখন রাজত্ব করছেন রোনালদিনহো, স্যামুয়েল ইতো, ডেকো, কার্লেস পুয়োলের মতো বাঘা বাঘা তারকারা। জাভি-ইনিয়েস্তারা নিজেদের মধ্যমাঠের কাণ্ডারি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছেন। সেই চাঁদের হাটে মেসি ছিলেন এক প্রতিভাবান কিশোর, যিনি মাত্রই নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করতে শুরু করেছেন।
আর্জেন্টিনার রোজারিওতে জন্ম নেওয়া মেসির শৈশব ছিল চরম সংগ্রামের। মাত্র ১১ বছর বয়সে তাঁর শরীরে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি ধরা পড়ে। চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা তাঁর পরিবারের পক্ষে অসম্ভব ছিল। ঠিক তখনই দেবদূতের মতো আবির্ভূত হয় বার্সেলোনা। বিখ্যাত লা মাসিয়া অ্যাকাডেমিতে মেসির ট্রায়াল হয় এবং বার্সার তৎকালীন পরিচালক কার্লেস রেক্সাচ একটি টিস্যু পেপারে মেসির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেন।
বাকিটা কেবলই ইতিহাস। বার্সেলোনার হয়ে ৭৭৮ ম্যাচে ৬৭২ গোল, ১০টি লা লিগা শিরোপা, ৪টি চ্যাম্পিয়নস লিগ এবং রেকর্ড ৮টি ব্যালন ডি’অর জিতে মেসি নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। ক্লাবের সীমানা ছাড়িয়ে আর্জেন্টিনার হয়ে কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরে ট্রফি ক্যাবিনেটের বৃত্ত পূর্ণ করেন তিনি।
লামিনে ইয়ামাল: মেসির আর্শীবাদপুষ্ট নতুন রাজপুত্র
মেসির কোলে যখন ইয়ামাল হাসছিলেন, তখন কে জানত যে এই ব্যবধান ঘুচে যাবে ১৭ বছর পর সবুজ গালিচায়! ২০০৭ সালের সেই কোলের শিশুই মাত্র সাড়ে ৬ বছর বয়সে ২০১৪ সালে যোগ দেন বার্সেলোনার বিখ্যাত একাডেমি ‘লা মাসিয়া’য়। সেখানে তাঁর ফুটবলীয় মেধা দেখে একাডেমির কোচরা অবাক হয়ে যেতেন।
২০২৩ সালের এপ্রিলে মাত্র ১৫ বছর ২৮৫ দিন বয়সে বার্সেলোনার মূল দলের হয়ে লা লিগায় অভিষেক ঘটে ইয়ামালের। এরপর ১৬ বছর বয়সে স্পেনের জাতীয় দলের হয়ে তাঁর অভিষেক হয়, যা স্প্যানিশ ফুটবলের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়ের রেকর্ড।
ইউরো ২০২৪-এ ফ্রান্সের বিরুদ্ধে তাঁর করা অতিমানবীয় বাঁ পায়ের গোলটি এবং পুরো টুর্নামেন্টে তাঁর জাদুকরী পারফরম্যান্স স্পেনকে ইউরোপসেরার মুকুট এনে দেয়। ২০২৬ সালের এই রানিং বিশ্বকাপে ইয়ামালই এখন স্পেনের সবচেয়ে বড় ভরসা এবং আক্রমণের মূল কারিগর। সবচেয়ে বড় বিস্ময়কর বিষয় হলো, বার্সেলোনা ক্লাবে মেসির রেখে যাওয়া সেই ঐতিহাসিক ও আইকনিক ‘১০ নম্বর’ জার্সিটি এখন ইয়ামালের গায়ে শোভা পাচ্ছে।
বিশ্বকাপের মেগা ফাইনালে মহাকাব্যিক মুখোমুখি
নিয়তি ফুটবল বিশ্বকে এক অভূতপূর্ব ও অভাবনীয় রোমাঞ্চের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। আগামী রবিবার মধ্যরাতে বিশ্বখ্যাত মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং অপ্রতিরোধ্য স্পেন।
এই ফাইনাল কেবল দুই দেশের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নয়; এটি ফুটবলীয় রূপকথার এক পরম সত্য হয়ে ওঠার রাত। যে মেসি একদিন পরম মমতায় এক শিশুকে কোলে নিয়ে হাসছিলেন, সেই শিশুই আজ বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হয়ে একই মাঠে মেসির মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন।
একসময়ের সেই স্নেহশীল ‘ধাই-মা’ মেসি আর আজকের মহাতারকা লামিনে ইয়ামাল—সবুজ চত্বরে প্রথমবারের মতো কে হাসবেন শেষ হাসি? ফুটবল অনুরাগীরা এখন অধীর আগ্রহে প্রহর গুনছেন বিশ্ব ফুটবলের এই ঐতিহাসিক মেলবন্ধন দেখার জন্য।