ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

ছন্দের পতন প্রকৃতিতে

চট্টগ্রামে আট দিনের মহাবর্ষণ কি জলবায়ু বিপর্যয়ের অশনিসংকেত?


  • আপলোড সময় : শনিবার ১৮ জুলাই, ২০২৬ সময় : ২:০৯ পিএম

গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশের প্রকৃতিতে একের পর এক চরম ও বিপরীতমুখী রূপ দেখা যাচ্ছে, যা আবহাওয়াবিদ ও গবেষকদের গভীরভাবে চিন্তিত করে তুলেছে। প্রথমে টানা প্রায় চার মাস সম্পূর্ণ বৃষ্টিহীন শুষ্কতা, এরপর তীব্র তাপপ্রবাহের মাস এপ্রিলে হঠাৎ স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৬ শতাংশ বেশি বৃষ্টি। আবার চিরচেনা বর্ষার মাস জুনে স্বাভাবিকের চেয়ে ২৯ শতাংশ বৃষ্টির ঘাটতিসহ তিন দফায় তীব্র তাপপ্রবাহ। আর প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনার সর্বশেষ ও সবচেয়ে বিধ্বংসী রূপটি দেখা গেল জুলাইয়ের শুরুতেই; যেখানে মাত্র আট দিনে চট্টগ্রাম ও দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ঝরেছে প্রায় দেড় হাজার মিলিমিটার বৃষ্টি। আবহাওয়ার এই চরম বৈপরীত্য ও খামখেয়ালিপনা আমাদের আগামী দিনের কোনো বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বার্তা দিচ্ছে কি না—তা নিয়ে এখন বিস্তর বিশ্লেষণ চলছে।

৭৩ বছরের ইতিহাসে বিস্তৃতিতে অনন্য চট্টগ্রামের এই মহাবর্ষণ

আবহাওয়া অধিদপ্তরের ১৯৫৩ সাল থেকে সংরক্ষিত উপাত্ত এবং পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৫ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত মাত্র আট দিনে চট্টগ্রামে মোট ১ হাজার ৪৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। একটানা বর্ষণের ইতিহাসে এটি গত ৭৩ বছরে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পরিমাণ বৃষ্টি। পরিসংখ্যানের দিক থেকে এটি দ্বিতীয় হলেও এর ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও তীব্রতার মাত্রা অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, অতীতে ২০০১ সালের জুনে সন্দ্বীপে একটানা আট দিনে ১ হাজার ৯৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টির যে সর্বোচ্চ রেকর্ড রয়েছে, তা মূলত সন্দ্বীপ ও হাতিয়া দ্বীপের মতো সুনির্দিষ্ট একটি বা দুটি স্টেশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এবারের বর্ষণ কেবল চট্টগ্রামের একটি নির্দিষ্ট স্টেশনের রেকর্ড নয়; বরং একই সময়ে চট্টগ্রাম নগরী, কক্সবাজার, সীতাকুণ্ড, সন্দ্বীপ, হাতিয়া, কুতুবদিয়া, টেকনাফ, বান্দরবান এবং রাঙামাটিসহ পুরো দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রায় সব আবহাওয়া স্টেশনেই একযোগে অতি ভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আট দিনে বান্দরবানে মোট ১ হাজার ১০২ মিলিমিটার, কুতুবদিয়ায় (৭ দিনে) ৯৯২ মিলিমিটার, কক্সবাজারে ৮৪৬ মিলিমিটার এবং সন্দ্বীপে ৭৬৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এই তুলনাই প্রমাণ করে, এবারের বৃষ্টির প্রধানতম বৈশিষ্ট্য ছিল এর দীর্ঘ স্থায়িত্ব এবং বিশাল ভৌগোলিক বিস্তার। চট্টগ্রামে বছরের মোট গড় বৃষ্টির পরিমাণ ২ হাজার ৯১৮ মিলিমিটার, যার অর্ধেকই ঝরে গেছে মাত্র এই এক সপ্তাহে!

স্থান/স্টেশনআট দিনের মোট বৃষ্টিপাত (মিলিমিটার)এক দিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত (মিলিমিটার)
চট্টগ্রাম১,৪৫৪ মিলিমিটার২৮৪ মিলিমিটার (৭ জুলাই)
বান্দরবান১,১০২ মিলিমিটার৩১৪ মিলিমিটার (৭ জুলাই)
কুতুবদিয়া৯৯২ মিলিমিটার (৭ দিনে)৩০০ মিলিমিটার (৮ জুলাই)
কক্সবাজার৮৪৬ মিলিমিটার২৪০ মিলিমিটার (৫ জুলাই)
রাঙামাটি৬৪৬ মিলিমিটার২৮৭ মিলিমিটার (৭ জুলাই)

এল নিনো ও জলবায়ুর ত্র্যহস্পর্শ: কেন এই অতিবর্ষণ?

সাধারণত বাংলাদেশে বর্ষাকালের বৃষ্টির স্থায়ী স্পেল বা পর্যায় ৩ থেকে ৫ দিন হয়ে থাকে। তবে এবার টানা আট দিন ধরে দৈনিক গড়ে ১৮২ মিলিমিটার করে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ার পেছনে সক্রিয় মৌসুমি বায়ু, বঙ্গোপসাগরের অতি আর্দ্রতা এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় জলবায়ুগত ঘটনা ‘এল নিনো’ (El Niño)-র সম্মিলিত প্রভাব ছিল বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদেরা।

আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, এল নিনোর প্রভাবে বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক ‘কনভারজেন্স’ (বায়ু এক জায়গায় মিলিত হওয়া) এবং ‘ডাইভারজেন্স’ (বায়ু ছড়িয়ে পড়া) জোনের অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। এর ফলে নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে ঘূর্ণিবায়ুর আবর্তন অত্যন্ত সুসংগঠিত হয়ে ওঠে। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা জলীয় বাষ্পপূর্ণ আর্দ্র মৌসুমি বায়ু যখন চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ে বাধা পেয়ে ওপরে উঠে যায়, তখন তা দ্রুত শীতল হয়ে তীব্র মেঘমালা ও দীর্ঘস্থায়ী অতিবর্ষণ তৈরি করে। বায়ুমণ্ডল যত উষ্ণ হচ্ছে, তার জলীয় বাষ্প ধরে রাখার ক্ষমতা তত বাড়ছে, যার ফলে অল্প সময়ের মধ্যে মেঘ ফেটে তীব্র বৃষ্টি হিসেবে তা ঝরে পড়ছে।

ঋতুর ছন্দপতন ও আগামীর বড় বিপর্যয়

গবেষকদের মতে, এই অতিবৃষ্টি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশের আবহাওয়ায় যে চরম অস্থিরতা দেখা গেছে, এটি তারই ধারাবাহিকতা। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঋতুগুলো তাদের চিরচেনা ছন্দ হারিয়ে ফেলছে। যে সময় তীব্র গরম থাকার কথা (এপ্রিল), তখন হচ্ছে অকাল বন্যা; আবার যখন মুষলধারে বর্ষা নামার কথা (জুন), তখন দেশ পুড়ছে খরায় ও তাপপ্রবাহে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (BUET) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম এই পরিস্থিতিকে দেশের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, বার্ষিক মোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণ খুব বেশি না বাড়লেও বৃষ্টির ধরন সম্পূর্ণ বদলে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় খরা থাকার পর হঠাৎ কয়েক দিনে পুরো মাসের বৃষ্টি একসাথে ঝরে পড়ছে। এই আকস্মিক ও তীব্র পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের নগর-পরিকল্পনা, পাহাড়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক উন্নয়ন ভাবনায় প্রকৃতির এই বৈরী ও চরমভাবাপন্ন আচরণকে এখনই গুরুত্বের সাথে বিবেচনা না করলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর