সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:
দু’সপ্তাহের টানা বৃষ্টিতে ভয়াবহ
জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে সাতক্ষীরা
পৌরসভাসহ সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ
এলাকা। এতে ভেঙে পড়েছে
স্যানিটেশন ব্যবস্থা, ডুবে গেছে বাড়িঘর
ও ছড়িয়ে পড়েছে পানিবাহিত রোগ। পৌরসভায় অচল
হয়ে পড়া ড্রেনেজ ব্যবস্থা
ও শহরতলীতে অপরিকল্পিতভাবে মাছের ঘের করাকে জলাবদ্ধতার
কারণ বলছেন ভুক্তভোগীরা। এছাড়া অতিবর্ষণে জেলার কোটি টাকারও অধিক
মাছ ভেসে গেছে। ৬
হাজার হেক্টর জমির আউশ ধান
ও সবজি ক্ষেত তলিয়ে
গেছে।
সাতক্ষীরা
আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা
যায়, ১ জুলাই থেকে
১৮ জুলাই সকাল ৬ টা
পর্যন্ত জেলায় মোট ৪৫৬ মিলিমিটার
বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর
মধ্যে ১০ জুলাই সর্বোচ্চ
২২৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়।
পৌরসভা
সাতক্ষীরার কামালনগর, ইটাগাছা, মধুমল্লারডাঙ্গী, বদ্দীপুর কলোনি, মধ্যকাটিয়া, রইচপুর, রাজারবাগান, পুরাতন সাতক্ষীরাসহ সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ
এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে কোমরসমান জলাবদ্ধতা। এতে বেড়েছে চরম
নাগরিক দুর্ভোগ।
ডুবে
যাওয়া ঘর-বাড়িতে রান্না-বান্না দুষ্কর। সাপ ও পোকা-মাকড়ের উপদ্রবে আতঙ্কিত জনসাধারণ। রাস্তা জলমগ্ন থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে অনেক
এলাকায়।
এ
বিষয়ে বদ্দীপুর কলোনির ছলেমা খাতুন জানান, “আমরা ১ যুগ
ধরে এ অবস্থায় আছি।
বৃষ্টি হলেই আমাদের এই
এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। রান্না-বান্না
করা সম্ভব হয় না। ছেলে-মেয়েরা স্কুল-কলেজে যেতে পারে না।
প্রথম শ্রেণির পৌরসভার মধ্যে বসবাস করে আমরা ন্যূনতম
নাগরিক সেবা পাই না।”
রইচপুর
এলাকার আবু জাফর জানান,
“বৃষ্টির পানি এতটুকু সরছে
না। রইচপুরের নিচের দিকে অনেকগুলো মাছের
ঘের। তাই পানি সরতে
পারছে না। দীর্ঘদিন জমা
পানি বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। তাই
ঘরে ঘরে চর্মরোগ বেড়েছে।”
এ
বিষয়ে ইটাগাছা এলাকার মোকাররম বিল্লাহ জানান, “আমাদের পরিবারের সবার পায়ে ঘা-পাচড়া হয়েছে। একদিকে যেমন প্রচুর চুলকাচ্ছে,
অন্যদিকে জ্বালা-যন্ত্রণা ও করছে।”
মধ্যকাটিয়া
এলাকার জাহানারা বেগম জানান, “আমাদের
পুরো রাস্তা পানিতে ডুবে আছে। ছেলে-মেয়েরা স্কুল-কলেজে যেতে পারে না।
তার ওপর এখন মাধ্যমিক
ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা।
মানুষ গ্রাম থেকে শহরে আসে
ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া যাতে ভালো হয়,
তার জন্য। আর আমাদের কি
কপাল! জলাবদ্ধতার কারণে ঘর থেকে বের
হতে পারি না।”
শহরের
মধ্যে বিধিবহির্ভূত ভবন নির্মাণ করা
জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। এছাড়া শহরতলীতে যত্রতত্র মাছের ঘের জলাবদ্ধতার প্রধান
কারণ বলে মনে করেন
নাগরিক অধিকার উন্নয়ন কমিটির সহ-সভাপতি ডা.
আবুল কালাম বাবলা।
তিনি
বলেন, “সাতক্ষীরা পৌরসভাসহ সদর উপজেলার অধিকাংশ
জায়গায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। স্কুল-কলেজগামী ছাত্র-ছাত্রীরা পড়েছে বিপাকে। রসুলপুর, কামালনগরসহ বিভিন্ন জায়গায় এই যে জলাবদ্ধতা
সৃষ্টি হয়েছে, এটা দূর করতে
খালগুলো গভীর করতে হবে।
এছাড়া যারা যত্রতত্র মাছ
চাষ করছে, পানি আটকে রাখছে—এগুলো অপসারণ করা আমাদের দাবি।
এছাড়া নেট-পাটা অপসারণ
করাও জরুরি।”
এছাড়া
অন্যান্য ক্ষয়-ক্ষতির বিষয়ে
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার রুহুল আমিন বলেন, “অতিবর্ষণে
জেলার ৬৩টি প্রাইমারি স্কুল
জলাবদ্ধতার কবলে রয়েছে। এর
মধ্যে আশাশুনি উপজেলায় ২০টি, কলারোয়ায় ১০টি, তালায় ১টি, শ্যামনগরে ১২টি
ও সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় ২০টি
স্কুল ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। চেয়ার-বেঞ্চ ডুবে যাওয়ায় সেসব
স্কুলগুলোতে ক্লাস চালানো খুবই কষ্টের। তবুও
কোমলমতি শিশুদের কথা ভেবে কষ্ট
করে হলেও ক্লাস পরিচালনা
করা হচ্ছে। এর মধ্যে সদর
উপজেলার বাগডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস পরিচালনা করতে পারছেন না
শিক্ষকরা।”
জেলা
মৎস্য অফিসার জি. এম. সেলিম
জানান, “বৃষ্টির পানিতে ২ শতাধিক মাছের
ঘের ভেসে গেছে, যার
আনুমানিক ক্ষয়-ক্ষতি কোটি
টাকা।”
কৃষি
সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাইফুল
ইসলাম বলেন, “৬ হাজার হেক্টর
আউশ ধানের ক্ষতি হয়েছে। আর কিছু সবজি
ক্ষেত পচে গেছে।”