লাতিন আমেরিকার বাসিন্দারা ঐতিহ্যগতভাবে ফুটবল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নিজেদের অঞ্চলের (লাতিন আমেরিকা) দলগুলোর পক্ষেই অবস্থান নেন। তবে এবারের ২০২৬ বিশ্বকাপে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অসংখ্য মিম, কৌতুক এবং তীব্র সমালোচনা ভিন্ন এক চিত্র দেখাচ্ছে। পুরো লাতিন আমেরিকায় কেবল একটি দলের ক্ষেত্রে এই আঞ্চলিক সংহতির বিষয়টি ব্যতিক্রম রূপ নিয়েছে; আর সেই দলটি হলো—বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
সম্প্রতি স্প্যানিশ তরুণ ফুটবল সেনসেশন লামিনে ইয়ামালের একটি কৃত্রিমভাবে সম্পাদিত (এডিটেড) ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হু হু করে ভাইরাল হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ইয়ামাল ব্রাজিলের বিখ্যাত হলুদ-সবুজ জার্সি পরে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন। আর সেই ছবির ক্যাপশনে লেখা—‘ব্রাজিলিয়ানদের শেষ ভরসা।’
বিশ্বকাপের মেগা ফাইনাল ম্যাচ ঘিরে আর্জেন্টিনার প্রতি এই বৈরি মনোভাব কেবল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলেই সীমাবদ্ধ নেই। মেক্সিকো, কলম্বিয়া, চিলিসহ লাতিন অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোও মনেপ্রাণে আশা করছে আজ রাতের ফাইনালে মেসিরা যেন স্পেনের কাছে হেরে যান। এর আগে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সময়ও লাতিন অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে এমন তীব্র আর্জেন্টিনাবিরোধী মনোভাব দেখা গিয়েছিল।
ফিফার ‘আদরের সন্তান’ এবং রেফারিংয়ের সুবিধা
আর্জেন্টিনাকে নিয়ে লাতিন প্রতিবেশীদের এমন নেতিবাচক মনোভাবের কারণ সম্পর্কে কলম্বিয়ার প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী জার্মান গোমেজ সংবাদ সংস্থা এএফপিকে বলেন, "আর্জেন্টিকার ক্ষেত্রে লাতিন আমেরিকার চিরাচরিত সংহতির ধারাটি সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে। বর্তমান ডিজিটাল যুগ মানুষের মনে এমন কিছু ধারণাকে উসকে দিয়েছে, যার ফলে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীরা মনে করছেন—আর্জেন্টিনার এই দলটি ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর অত্যন্ত প্রিয় বা আদরের দল।"
ব্রাজিলের সাও পাওলোর একটি শপিং সেন্টারে ম্যাচ নিয়ে কথা বলার সময় সান্তোস নামের এক ক্ষুব্ধ ব্রাজিলিয়ান সমর্থক বলেন, "আর্জেন্টিনা পুরো টুর্নামেন্টে রেফারিদের কাছ থেকে অনৈতিকভাবে বাড়তি সুবিধা পেয়ে এসেছে। তারা মাঠের খেলায় জিতার চেয়ে রেফারিদের সাহায্যে চতুর্থ শিরোপা পাওয়ার চেয়ে স্পেনের মতো যোগ্য দলের দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হওয়াটাই হাজার গুণ উত্তম।"
কলম্বিয়ার বোগোটার ২৮ বছর বয়সী তরুণ হুয়ান কামিলো আবুসাইদও একই সুরে বলছেন, "লাতিন আমেরিকার দল হলেও আমরা আজ রাতে স্পেনের জন্যই গলা ফাটাব।"
‘পুরোটাই রাজনৈতিক’
আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে একজন বিশ্বসেরা কিংবদন্তি হিসেবে শ্রদ্ধা করলেও মেক্সিকো সিটির ৫১ বছর বয়সী পুলিশ কর্মকর্তা আন্তোনিও লোপেজ মাঠের সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, "চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য আপনি যদি মাঠের ভেতর ঘাম ঝরান এবং কঠোর পরিশ্রম করে জয় ছিনিয়ে আনেন, তবে তা আমরা সানন্দে মেনে নেব। কিন্তু রেফারিরা যদি আপনাকে ম্যাচ জেতাতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সাহায্য করতে আসে, সেটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।"
চলতি বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক দেশ মেক্সিকোতে বেশ বৃহৎ পরিসরে এই আর্জেন্টিনাবিরোধীতা দেখা গেছে। সম্প্রতি এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শিনবাউম রসিকতা করে সাংবাদিকদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, আজ রাতের ফাইনালে তাঁরা কোন দলকে সমর্থন করছেন। প্রেসিডেন্টের সেই প্রশ্নের উত্তরে উপস্থিত সাংবাদিকরা একদম সমস্বরে চিৎকার করে বলে ওঠেন, "স্পেন... স্পেন।"
খেলাধুলার সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব নিয়ে কাজ করা মেক্সিকান নৃবিজ্ঞানী অধ্যাপক হোর্হে নেগ্রো বলেন, "চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপটি যে মাঠের চেয়েও সামাজিকভাবে অত্যন্ত রাজনৈতিক, এই ঘটনাগুলো তারই প্রমাণ।"
কলম্বিয়ার সমাজবিজ্ঞানী জার্মান গোমেজ এই প্রসঙ্গে অতীতের সাথে বর্তমানের তুলনা টেনে বলেন, "একসময় আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে ফিফার একচ্ছত্র ক্ষমতার মুখোমুখি হওয়া একজন বিপ্লবী হিসেবে দেখা হতো। অথচ বর্তমান যুগে এসে লিওনেল মেসিকে ফিফার ‘আদরের সন্তান’ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে, যা ফুটবলপ্রেমীদের একটি বড় অংশ মেনে নিতে পারছে না।"
ক্ষোভের নেপথ্যে জাতীয় রাজনীতি
শুধু ফুটবলীয় কারণই নয়, আর্জেন্টিনার অভ্যন্তরীণ জাতীয় রাজনীতিও প্রতিবেশীদের মনে এক ধরনের তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোর ২৯ বছর বয়সী বাসিন্দা রাচিদ শ্যোবার্গ চিলির অবস্থান পরিষ্কার করে বলছেন, "আমি আর্জেন্টিনার বর্তমান কট্টরপন্থী প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইকে বিন্দুমাত্র পছন্দ করি না। মেসিরা আজ রাতে ফাইনাল জিতলে প্রেসিডেন্ট মিলেই সেই বিশ্বকাপ জয়ের সমস্ত রাজনৈতিক গৌরব নিজের নামে প্রচার করবেন এবং দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করবেন। চিলির নাগরিক হিসেবে এটা আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারব না।" সব মিলিয়ে আজ রাতের ফাইনালে মেসিদের রুখতে লাতিন আমেরিকার সিংহভাগ মানুষ এখন স্পেনের লামিনে ইয়ামালের ওপরই ভরসা রাখছেন।
আকাশজমিন / আরআর