ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

আমনের বীজতলা ও সবজি নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক

ভারী বৃষ্টিতে দুমকিসহ উপকূলে তলিয়েছে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ


  • আপলোড সময় : রবিবার ১৯ জুলাই, ২০২৬ সময় : ৭:৪৭ পিএম

মো. গোলাম কিবরিয়া, দুমকি (পটুয়াখালী)  প্রতিনিধি  :

টানা এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা মুষলধারে ভারী বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় পটুয়াখালীর দুমকিসহ সমগ্র উপকূলীয় জনপদের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ও ফসলের মাঠ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয় ও ক্ষতির মুখে পড়েছে আমনের বীজতলা এবং চলতি মৌসুমের গ্রীষ্মকালীন সবজির আবাদ। উপকূলের কোথাও কোথাও জমে থাকা পানি ধীরগতিতে নামতে শুরু করলেও দীর্ঘ সময় ধরে জলাবদ্ধ থাকায় বীজতলা ও সবজিক্ষেত আদৌ রক্ষা করা যাবে কি না—সেই চরম অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে হাজারো কৃষকের। স্থানীয় কৃষি বিভাগও আশঙ্কা করছে, ক্ষতিগ্রস্ত বীজতলার কারণে চলতি মৌসুমের কাঙ্ক্ষিত আমন আবাদ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হতে পারে।

দুমকি উপজেলার লেবুখালী ইউনিয়নের আঠারগাছিয়া গ্রামের প্রান্তিক কৃষক খলিল সিকদার আক্ষেপ করে জানান, এক সপ্তাহের টানা বর্ষণে তার আমনের বীজতলা সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে পচে নষ্ট হয়ে গেছে। একই ধরনের চরম ক্ষতির কথা জানিয়েছেন শ্রীরামপুর ইউনিয়নের রাজাখালী এলাকার কৃষক আব্দুল মজিদ হাওলাদার, কবির হাওলাদার ও হাবিবুর রহমান মৃধাসহ আরও অনেকে। তাদের দাবি, মাঠ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পানি না নামলে নতুন করে চড়া দামে বীজ কিনে বীজতলা তৈরি করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকবে না।

দক্ষিণ উপকূলের বিভিন্ন উপজেলা ঘুরেও একই রকম বুকফাটা হাহাকারের চিত্র দেখা গেছে। গলাচিপা উপজেলার চর কাজল ইউনিয়নের কৃষক মো. হানিফ চৌকিদার তার ১৩ একর জমিতে আমন চাষের আগাম প্রস্তুতি হিসেবে প্রায় ২২ হাজার টাকা ব্যয়ে চার মণ বীজধান কিনে বীজতলা তৈরি করেছিলেন। জমি প্রস্তুত ও পরিচর্যায়ও তার অতিরিক্ত অনেক অর্থ ব্যয় হয়। কিন্তু টানা বর্ষণে তার পুরো বীজতলাটিই এখন গভীর পানির নিচে নিমজ্জিত।

হানিফ চৌকিদার বলেন, "মৌসুমের শুরুতেই প্রকৃতির এমন বৈরী আচরণে এত বড় ক্ষতির মুখে পড়ব তা কখনো ভাবিনি। বীজতলা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেলে আবার নতুন করে ধার-দেনা করে সব শুরু করতে হবে।" একই উপজেলার কৃষক এছিন মৃধাও তার পাঁচ একর জমির জন্য প্রায় ১১ হাজার টাকার বীজ কিনে বীজতলা করেছিলেন। অতিবৃষ্টির কারণে তার বীজতলাও দীর্ঘ সময় ধরে পানির নিচে তলিয়ে আছে। তিনি বলেন, "বীজতলার অবস্থা খুবই নাজুক। নতুন করে বীজতলা করতে হলে উৎপাদন খরচ যেমন দ্বিগুণ বাড়বে, তেমনি চাষাবাদের সময়ও অনেক পিছিয়ে যাবে।"

শুধু আমনের বীজতলাই নয়, মাঠডুবি পানিতে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন উপকূলের গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষিরাও। রাঙ্গাবালী উপজেলার চর গঙ্গা এলাকার সবজি চাষি রাসেল হাওলাদার পাঁচ শতাংশ জমিতে পুঁইশাক, ঢেঁড়স, বরবটি, পেঁপে ও লালশাকের আবাদ করেছিলেন। এতে তার মোট ব্যয় হয় প্রায় ১১ হাজার টাকা। ইতোমধ্যে সাত হাজার টাকার সবজি বিক্রি করতে পারলেও মাঠে থাকা অবশিষ্ট সবজির সম্ভাব্য বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৩০ হাজার টাকা। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে পুরো ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ায় তিনি সর্বস্বান্ত। রাসেল হাওলাদার বলেন, "পেঁপে গাছ ছাড়া অন্য কোনো সবজি এই পচা পানিতে বাঁচবে বলে মনে হচ্ছে না।" একই উপজেলার দক্ষিণ বাহেরচর গ্রামের কৃষক সুপন মাহমুদ ১০ শতাংশ জমিতে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করেছিলেন। প্রায় ১৫ হাজার টাকা ব্যয়ের বিপরীতে মাত্র দেড় হাজার টাকার সবজি বিক্রি করতে না করতেই বৃষ্টির পানিতে তার পুরো ক্ষেতটি পুরোপুরি ডুবে যায়। তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, "এখন কীভাবে এই ফসল বাঁচাব, সেটাই বুঝে উঠতে পারছি না।"

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত পটুয়াখালীর উপকূলীয় এলাকায় রেকর্ড পরিমাণ মোট ৪৪৮ দশমিক ৩১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এই অতিবৃষ্টির ফলেই জেলার নিচু এলাকার বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে জেলার প্রায় ২ হাজার ৮০৫ হেক্টর ফসলি জমি মারাত্মক ক্ষতির ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

কৃষি বিভাগের হিসাব মতে, ঝুঁকির মুখে থাকা ফসলের মধ্যে রয়েছে আউশ ধানের ৫২০ হেক্টর, আমনের বীজতলার ৯৭০ হেক্টর, শাকসবজির ৮৫০ হেক্টর, পানের ১২০ হেক্টর, কলার ৮০ হেক্টর, অন্যান্য ফসলের ৪০ হেক্টর, গ্রীষ্মকালীন তরমুজের ৪ হেক্টর, পেঁপের ২২০ হেক্টর এবং মরিচের শূন্য দশমিক ৫ হেক্টর জমি। চলতি মৌসুমে জেলায় মোট এক লাখ ৮৯ হাজার ৮৩৮ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার জন্য প্রয়োজন ছিল প্রায় ১৩ হাজার ৮০১ হেক্টর বীজতলা। তবে বর্তমান বন্যাসদৃশ পরিস্থিতিতে অনেক কৃষককে নতুন করে বীজতলা তৈরি করতে হতে পারে, যা আমন রোপণের স্বাভাবিক সময়সূচিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি সবজির উৎপাদন কমে গেলে বাজারে এর সরবরাহ সংকুচিত হয়ে দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পটুয়াখালী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মোহাম্মদ আমানুল ইসলাম বলেন, "এক সপ্তাহের টানা ভারী বৃষ্টিতে জেলার নিচু এলাকার অনেক কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত আর্থিক হিসাব এখনো নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। মাঠ থেকে পানি পুরোপুরি নেমে গেলে আমাদের কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে প্রকৃত ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করবেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াবেন।"


এ সম্পর্কিত আরো খবর