বিশ্বকাপ চলাকালেই আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নানা কর্মকাণ্ড ও বিতর্কিত আচরণ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ও কাটাছেঁড়া শুরু হয়েছিল। বিশ্বকাপ ফুটবল আসর শেষ হতে না হতেই তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্তের আবেদন জানানো হয় আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) কাছে। যদিও বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে দুটি সংস্থাই সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র গঠনতন্ত্র ও নিজস্ব শাসন কার্যক্রম মেনে পরিচালনা করে থাকে। তাই আইওসি বিষয়টি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে যে, ফিফা প্রধানের এই জাতীয় কর্মকাণ্ডের ওপর কোনো তদন্ত চালানোর এখতিয়ার বা আইনি অধিকার তাদের নীতিমালায় নেই। ঘটনাটির মূল সূত্রপাত ঘটেছিল টুর্নামেন্টের শেষ ষোলোর একটি হাইভোল্টেজ ম্যাচে, যেখানে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়ের ম্যাচে সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন যুক্তরাষ্ট্রের তারকা স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগান। ফুটবলের স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী ম্যাচে বেলজিয়ামের বিপক্ষে তার নিষিদ্ধ থাকার কথা ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপে ফোলারিন বালোগানের ওপর আরোপিত সেই নিষেধাজ্ঞা ১২ মাসের জন্য স্থগিত করে ফিফা। একটি দেশের রাজনৈতিক রাষ্ট্রপ্রধানের কথায় ফিফা প্রধানের এমন অভূতপূর্ব সিদ্ধান্তে ক্রীড়াবিশ্বে তোলপাড় সৃষ্টি হয় এবং সভাপতি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপে ফিফার নীতি ও স্বায়ত্তশাসন লঙ্ঘনকে কেন্দ্র করেই মানবাধিকারভিত্তিক প্রচারণা সংস্থা 'ফেয়ারস্কয়ার' আইওসির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগটি দায়ের করেছিল। সংস্থাটির মূল দাবি ছিল, রাজনৈতিকভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতি প্রকাশ্য পক্ষপাত ও সমর্থন জানিয়ে ফিফা প্রধান আন্তর্জাতিক অলিম্পিক সনদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার নীতি পুরোপুরি লঙ্ঘন করেছেন। উল্লেখ্য, ফিফা সভাপতি ২০২০ সাল থেকে আইওসির একজন অন্যতম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক সনদের সুস্পষ্ট দ্বিতীয় ধারায় উল্লেখ আছে যে, আইওসির কোনো সদস্য কোনো সরকার, রাষ্ট্রীয় সংস্থা বা অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের এমন কোনো নির্দেশনা গ্রহণ করতে পারবেন না, যা তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা ভোটদানে প্রভাব ফেলে। তবে ফেয়ারস্কয়ারের সেই তদন্ত আবেদনের প্রেক্ষিতে এক অফিসিয়াল বার্তায় অলিম্পিক কমিটি জানিয়েছে, ফিফা সভাপতির বিরুদ্ধে আনা এই অভিযোগটি মূলত ফিফার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা, বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে তাদের প্রশাসনিক সম্পর্ক এবং ফুটবলের আইনকানুন বাস্তবায়ন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের আওতাধীন। এসব বিষয় অলিম্পিক কমিটির নৈতিকতা বিধির আওতাভুক্ত নয়। অর্থাৎ, সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও স্বাধীন সংস্থা ফিফা বা তাদের কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এমন কর্মকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধানের কোনো ক্ষমতা অলিম্পিক কমিটির হাতে নেই।
অলিম্পিক কমিটির পক্ষ থেকে এই ব্যাখ্যার ঠিক ওই মুহূর্তেই নতুন বিতর্ক সামনে এসেছে। নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশন (এনএফএফ) ফোলারিন বালোগানের স্বয়ংক্রিয় এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা বাতিল করার এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ফিফার নিজস্ব নৈতিকতা কমিটিতেই একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়েরের কথা গভীরভাবে বিবেচনা করছে। নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি লিসে ক্লাভেনেস সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, পুরো ঘটনায় তাদের সংস্থা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আগামীতে তাদের পরবর্তী বোর্ড সভায় ফিফা সভাপতির এই বিতর্কিত ভূমিকার বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হবে কি না, সে ব্যাপারে তারা দ্রুতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।