গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে লিওনেল মেসি আলবিসেলেস্তেদের ফুটবলের প্রতিচ্ছবি ও মূল প্রতীক হয়ে আছেন। তবে সম্প্রতিক এক ইতিহাস অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও বিস্ময়কর তথ্য। গবেষণায় দেখা গেছে, মেসির পরিবারের শেকড় মূলতঃ প্রতিবেশী দেশ ব্রাজিলেও ছড়ানো ছিল। ইতিহাস একটু অন্যরকম হলে ফুটবল বিশ্বের এই জীবন্ত কিংবদন্তির জীবনের গল্প হয়তো একেবারেই ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারত। সামান্য কিছু সমীকরণ ও পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে আলবিসেলেস্তে নীল-সাদা পোশাকের বদলে হয়তো ব্রাজিলের বিখ্যাত হলুদ জার্সিতেও দেখা যেতে পারত তাকে। ইতালি ও দক্ষিণ আমেরিকার অভিবাসন সংক্রান্ত নথিপত্র ঘেঁটে এই যুগান্তকারী গবেষণাটি প্রথম প্রকাশ করে ব্রাজিলের স্বনামধন্য সংবাদমাধ্যম গ্লোবো। পুরো গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন ইতালির বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ফিওরেনজো সান্তিনি। তিনি নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে মেসির পারিবারিক বংশতালিকা খুঁজে বের করেন। গবেষকের সেই গবেষণায় স্পষ্ট উঠে এসেছে যে, মেসির এক প্রপিতামহ ব্রাজিলের বিখ্যাত সাও পাওলো রাজ্যে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীতে বিশ শতকের শুরুর দিকে পরিস্থিতির প্রয়োজনে তার পরিবার আর্জেন্টিনায় পাড়ি জমায়।
এই ঐতিহাসিক যাত্রার সূচনা ঘটেছিল মূলত মেসির প্রপিতামহের বাবা রানিয়েরো কোচেত্তিনিকে দিয়ে। ইতালির সান সেভেরিনো মার্কেতে জন্ম নেওয়া রানিয়েরো তার স্ত্রী রোজা রিচেজ্জাকে সঙ্গে নিয়ে একসময় ব্রাজিলে চলে যান। সে সময় দারিদ্র্য ও কাজের সন্ধানে ইতালি থেকে দক্ষিণ আমেরিকার উদ্দেশ্যে বহু মানুষ পাড়ি জমাচ্ছিল এবং সেই অভিবাসন স্রোতেরই একটি অংশ ছিল এই পরিবারটি। তারা প্রথমে বিখ্যাত সান্তোস বন্দরে এসে পৌঁছান। অভিবাসন দপ্তরের নথিতে অনেকের নাম ভুলভাবে নিবন্ধিত হওয়ার সাধারণ ঘটনার ধারাবাহিকতায় রানিয়েরো কোচেত্তিনির নাম নথিতে বদলে হয়ে যায় রামিয়েরো কনসেন্তিনি। এর পর থেকে তাদের বংশের পদবি নানাভাবে পরিবর্তিত হতে থাকে। পরবর্তীতে সান্তোস থেকে পরিবারটি কফি ব্যবসায়ী মার্তিনিও প্রাদো জুনিয়রের খামারে কৃষিকাজের উদ্দেশ্যে সাও পাওলোর গ্রামাঞ্চলে চলে যায়। সেখানেই তাদের এক সন্তান আর্দেরিগো কোচেত্তিনির জন্ম হয়, যিনি পরে ফেদেরিকো কুচ্চিতিনি নামে নিবন্ধিত হন। এই ফেদেরিকো কুচ্চিতিনিই ছিলেন ফুটবলের মহাতারকা লিওনেল মেসির সরাসরি প্রপিতামহ।
তবে ব্রাজিলে পরিবারটির অবস্থান খুব বেশিদিন টেকেনি। প্রপিতামহ ফেদেরিকো কুচ্চিতিনির বয়স যখন মাত্র এক বছর, তখনই পুরো কোচেত্তিনি পরিবার ব্রাজিল ছেড়ে আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে চলে যায়। আর সেই রোজারিওতেই জন্ম নেয় ফুটবল দুনিয়ার সবচেয়ে চর্চিত ও বিখ্যাত এক অধ্যায়। এর পর থেকে পরিবারের পুরো শিকড় ও ইতিহাস আর্জেন্টিনাতেই ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্রাজিলের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবে ফিফার বর্তমান নিয়মানুযায়ী দূর পূর্বপুরুষের সূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়া সম্ভব নয়, তাই কেবল প্রপিতামহের ব্রাজিলে জন্মের কারণে মেসির ব্রাজিল দলে খেলার আইনি সুযোগ ছিল না। কিন্তু ইতিহাসবিদরা বলছেন, রানিয়েরো কোচেত্তিনি যদি সেদিন ব্রাজিল ছেড়ে রোজারিওতে পাড়ি না জমাতেন, তবে মেসির জন্ম ব্রাজিলেই হতো এবং তিনি ব্রাজিলের হয়ে ফুটবল কাঁপাতে পারতেন। আট বারের ব্যালন ডি’অর জয়ী এই ফুটবল জাদুকরকে আজ আর্জেন্টিনা ছাড়া অন্য কোনো দেশের জার্সিতে কল্পনা করা অসম্ভব হলেও, ফুটবলের ইতিহাসে তাদের পরিবারের ব্রাজিল কানেকশনের এই তথ্য বিশ্বজুড়ে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।