আশরাফুল আলম, ইনস্ট্রাক্টর (জেনারেল), পিটিআই, টাঙ্গাইল
“শিশু হলো উদ্যানের চারাগাছ। শিক্ষক হলেন তার মালী। শিক্ষকের কাজ হলো সযত্নে চারাগাছটিকে বড় করে তোলা। শিশুর মধ্যে লুকিয়ে থাকা সৎ ও সামাজিক গুণাবলীর বিকাশ সাধন করা শিক্ষকের কর্তব্য’’। ফেডরিক ফ্রয়েবল
চিনের প্রাচীন নেতা কনফুসিয়াস বলেছেন-“শিক্ষক হবেন জ্ঞান ও প্রজ্ঞার উৎস। তিনি হবেন একজন আদর্শ শাসক”।
শিক্ষা আলোকিত সমাজ বিনির্মাণের হাতিয়ার।শিক্ষক হলো তার সুনিপুণ কারিগর। শিক্ষা ছাড়া আলোকিত মানুষ সৃষ্টি কোনভাবেই সম্ভব নয়। একজন শিক্ষকের কিছু কাজ ও দায়বদ্ধতা আছে। এ কাজ ও দায়বদ্ধতা সহকর্মীদের কাছে, সমাজের কাছে, দেশ ও জাতির কাছে, আগামী প্রজম্মের কাছে। একজন সফল মানুষের পেছনে শিক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। শিক্ষক শুধু সফল নয়, একজন ভালো মানুষ হতে শেখান। মানবিক বিপর্যয় বা বৈশ্বিক, অর্থনৈতিক সংকটে আক্রান্ত হয়েও সামাজিক, অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিনির্মাণে শিক্ষকরা অবিরাম ভূমিকা রেখে চলেছেন। শিক্ষক হচ্ছেন সভ্যতার ধারক-বাহক। শিক্ষক শুধু শিক্ষাদানই করেন না, তিনি মানুষ গড়ার কারিগরও।
পিটিআই প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য-
প্রশিক্ষণ-প্রয়োগ-সাফল্য এই প্রতিপাদ্য বিষয়কে উদ্দেশ্য করেই পিটিআই এর জন্ম। প্রশিক্ষণ( প্রকৃষ্ঠ+শিক্ষণ) শিক্ষক প্রশিক্ষণ হলো এমন একটি সুনির্দিষ্ট ও কাঠামোগত প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে শিক্ষকদের পাঠদান পদ্ধতি,শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা,শিক্ষণ-শিখন কলাকৌশল এবং বিষয়ের ওপর জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা হয়।
প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট(পিটিআই) প্রাথমিক শিক্ষায় একটি ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান।গুরু ট্রেনিং সেন্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও কালের পরিক্রমায় পিটিআই নামে সুপরিচিতি। আধুনিক ও মানসম্মত প্রশিক্ষণ,সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চা, ন্যায় ও শৃঙ্খলাবোধ, ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক তথা সুষম বিকাশ সাধনে পিটিআই এর ভূমিকা অত্যন্ত কার্যকর ও অনস্বীকার্য।
১. চাকরীরত প্রশিক্ষনবিহীন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্যে চাকরীকালীন এক বছর/দেড় বছর মেয়াদী প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা করা।
২. চাকরীরত শিক্ষকদের জন্যে স্বল্পকালীন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
৩. প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্যে একশান রিসার্চ,লেসন স্টাডি,আসাইনমেন্ট, কেস স্টাডি পরিচালনা করা।
৪) মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার সফল বাস্তবায়নে বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় গৃহীত প্রশিক্ষন কার্যক্রম পরিচালনায় সার্বিক সহযোহিতা করা।
৫) চলতি বছর থেকে ১৫টি পিটিআইতে চাকরিপূর্ব ১০ মাস মেয়াদী ডিপিএড কোর্স চালু হয়েছে। একজন স্নাতক লিখিত পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এই অনাবাসিক কোর্সে ভর্তি হতে পারেন।
পিটিআই এর কার্যাবলিঃ
ক) প্রশিক্ষণার্থী শিক্ষকদের বাংলাদেশের শিক্ষানীতি ও প্রাথমিক শিক্ষার ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান লাভে সহায়তা করা।
খ) প্রাথমিক শিক্ষাক্রম, বিভিন্ন শিক্ষাদান পদ্ধতি,কৌশল ও মূল্যায়ন সম্পর্কে জ্ঞান লাভে সহায়তা করা।
গ) শিক্ষার্থী শিক্ষকদের শিশু মনোবিজ্ঞানের জ্ঞান দানের মাধ্যমে শিশু শিক্ষার প্রায়োগিক জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করা।
ঘ) প্রাথমিক শিক্ষাক্রমের অন্তর্ভুক্ত বিষয় সমূহের তাত্ত্বিক পাঠদানে নবতর কলা-কৌশল সম্পর্কে বাস্তবজ্ঞান লাভে সহায়তা।
ঙ) ব্যবহারিক কাজের মাধ্যমে প্রশিক্ষণার্থী শিক্ষকদের শিক্ষা উপকরণ তৈরি,ব্যবহার ও সংরক্ষণের দক্ষতা অর্জনে সহায়তা
চ) প্রশিক্ষণ চলাকালীন প্রশিক্ষণার্থী শিক্ষকদের অনুশীলনী পাঠদানের মাধ্যমে শিশুদের উপযোগী পাঠদান কলাকৌশল আয়ত্বকরণে সহায়তা।
ছ) পিটিআইতে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থী শিক্ষকদের সময়ানুবর্তিতা,সদাচরণ,শালীনতা,শৃঙ্খলা, কর্মনিষ্ঠা ইত্যাদি গুণাবলী বিকাশে সহায়তা করা এবং দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন আনয়ন।
বাংলাদেশে ৬৪ টি জেলায় মোট ৬৭টি পিটিআই আছে।
জীবনের জন্যে শিক্ষা এবং নির্দিষ্ট পেশার জন্যে প্রশিক্ষণ। প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগে নিয়োজিত সহকারী শিক্ষক,প্রধান শিক্ষক, সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার,শিক্ষক(পরীক্ষণ বিদ্যালয়) সহকারী ইনস্ট্রাক্টর ও ইনস্ট্রাক্টর(ইউপিইটিসি),ইনস্ট্রাক্টর(পিটিআই) উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট( পিটিআই)সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সকল অংশীজনের পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়ানোর জন্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণ প্রদান করে।
পিটিআই ব্যবস্থাপনা
পিটিআইয়ের সামগ্রিক কর্মকান্ড পরিচালনা ও প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে অর্জনের জন্যে নিম্নরপ কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োজিত রয়েছেন-
০১)সুপারিনতেনডেন্ট-১জন ,০২)সহকারী সুপারিনটেনডেণ্ট-২জন, ০৩) ইনস্ট্রাক্টর(সাধারণ)-১২ জন, ০৪) বিষয়ভিত্তিক ইনস্ট্রাক্টর-৫ জন, ০৫) সহকারী লাইব্রেরীয়ান-১জন, ০৬) উচ্চমান সহকারী কাম হিসাব রক্ষক-১জন, ০৭)অফিস সহকারী-২জন ০৮)কম্পিউটার অপারেটর- ১জন, ০৯) মালী-১ জন,১০) পরিচ্ছন্নতাকর্মী-১জন, ১১) নৈশ প্রহরী-১জন
এছাড়াও পিটিআই সংলগ্ন পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের জন্যে ৫ জন (১০ম গ্রেড) শিক্ষক রয়েছে। এ বিদ্যালয়ের জন্যে কোন প্রধান শিক্ষকের পদ নেই। এটি সরাসরি পিটিআই সুপারিনটেনডেন্ট এর নিয়ন্ত্রণাধীন।
|
ক্রমিক
নম্বর |
কর্মকর্তার নাম |
পদসংখ্যা |
|
০১. |
সুপারিনটেনডেন্ট |
০১জন |
|
০২. |
সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট |
০২ জন |
|
০৩. |
ইনস্ট্রাক্টর (জেনারেল) |
১২জন |
|
০৪. |
ইনস্ট্রাক্টর (বিজ্ঞান) |
০১জন |
|
০৫. |
ইনস্ট্রাক্টর (কৃষি) |
০১ জন |
|
০৬. |
ইনস্ট্রাক্টর (শারীরিক
শিক্ষা) |
০১জন |
|
০৭. |
ইনস্ট্রাক্টর (চারু
ও
কারুকলা) |
০১ জন |
|
০৮. |
ইনস্ট্রাক্টর(কম্পিউটার
সায়েন্স) |
০১জন |
মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পিটিআই( প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট) শিক্ষকের দক্ষতা বৃদ্ধি, যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, কারিকুলাম বাস্তবায়ন এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্যে পরিদর্শন ও ফিডব্যাক প্রদান করে। এটি শিক্ষকদের
দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণ: সিএনএড, ডিপিএড, বিটিপিটি
স্বল্পমেয়াদী প্রশিক্ষণ: আইসিটি ইন এডুকেশন, বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ(টিওটি),
পিটিআই এর প্রধান ভূমিকাঃ
শিক্ষক প্রশিক্ষনঃ
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের(প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক) পেশাগত জ্ঞান,দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন করে মানসম্মত ওদক্ষ হিসেবে গড়ে তোলা।
২)শিক্ষকদের আধুনিক শিক্ষণ-শিখন পদ্ধতি ও কৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া।
মৌখিক বোর্ডের সদস্য: প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরিক্ষা ও জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক এর নির্বাচনী মৌখিক বোর্ডের সদস্য হিসেবে সুপারিনটেনডেন্ট, সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট ও সিনিয়র ইনস্ট্রাক্টরগণ অংশগ্রহন করে থাকেন।
মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ
শিক্ষকদের মাধ্যমে প্রাথমিক স্তরে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভার বহুমুখী বিকাশে সহায়তা করা।
শিক্ষকদের জন্যে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করা যা প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে সহায়ক।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (ইউপিইটিসি) সাবেক উপজেলা রিসোর্স সেন্টার(ইউআরসি) এর সাথে সমন্বয় সাধন ও সুপারিন্টেনডেন্ট কর্তৃক তত্ত্বাবধান।
পরিদর্শন ও মূল্যায়নঃ
প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো একাডেমিক পরিদর্শন করে শিক্ষকদের কার্যকারিতা যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় ফিডব্যাক প্রদান করা
প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা এবং মান উন্নয়নের জন্যে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
প্রশাসনিক ও একাডেমিক সহযোগিতা ও যোগাযোগ সাধনঃ
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ,প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সাথে যোগাযোগ ও সমন্বয় রক্ষা করে অর্পিত দায়িত্ব পালন।
স্থানীয় পর্যায়ে উদ্ভাবনী কার্যক্রম গ্রহন করা।
ইউপিইটিসি (উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র) তত্ত্বাবধানঃ পিটি আই তার আওতাভুক্ত ইউপিইটিসি গুলোর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ এবং কার্যক্রম পরিচালনা ও তত্ত্বাবধান করে।
ডাটাবেইস তৈরি:
প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের একটি ডাটাবেইস তৈরি করা হয়, যা তাদের পেশাগত উন্নয়নে সহায়তা করে এবং সরকারি নীতি নির্ধারণে তথ্য সরবরাহ করে।