ভুল চিকিৎসা, চিকিৎসাগত অবহেলা এবং গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা কার্যক্রমে অনভিজ্ঞ জনবল ব্যবহারের অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় নড়াইল শহরের ‘মডার্ন সার্জিক্যাল ক্লিনিক’ সিলগালা করেছে জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির অপারেশন থিয়েটারসহ সব ধরনের চিকিৎসা কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
শনিবার (২৫ জুলাই) দুপুরে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রতিনিধি, জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং নড়াইল জেলা বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে ক্লিনিকটি সিলগালা করা হয়।
ঘটনার সূত্রপাত গত ৪ জুলাই। নড়াইলের কালিয়া উপজেলার চাঁচুড়ি ইউনিয়নের বনগ্রামের ২০ বছর বয়সী অন্তঃসত্ত্বা সোহানা বেগমকে সন্তান প্রসবের জন্য মডার্ন সার্জিক্যাল ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। অন-কল চিকিৎসক ডা. সুব্রত কুমারের তত্ত্বাবধানে সিজারের মাধ্যমে তিনি একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। কয়েক দিন পর তাকে ছাড়পত্র দিয়ে বাড়ি পাঠানো হয়।
পরিবারের অভিযোগ, বাড়ি ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই সোহানার শরীরে মারাত্মক শারীরিক জটিলতা দেখা দেয় এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়। অবস্থার অবনতি হলে প্রথমে তাকে নড়াইল সদর হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জরুরি অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকেরা দেখতে পান যে, আগের সিজারের সময় প্রসূতির পেটের ভেতরে নাড়ির একটি অংশ থেকে যাওয়ায় মারাত্মক সংক্রমণ ও পচন ধরেছে। এ অবস্থায় জীবন বাঁচাতে চিকিৎসকদের বাধ্য হয়ে তার জরায়ু অপসারণ করতে হয়। ফলে মাত্র ২০ বছর বয়সে, প্রথম সন্তানের জন্মের পরই সোহানা চিরতরে হারান তার মাতৃত্বের সুযোগ।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনার পর ভুক্তভোগী পরিবার জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। অভিযোগের ভিত্তিতে গঠিত তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন, চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য গ্রহণ করে। তদন্তে ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার সত্যতা মেলায় ক্লিনিকটির বিরুদ্ধে এই প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ ও সিলগালা করা হয়।
ক্লিনিক সিলগালার সময় সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রতিনিধি ডা. আসিফুর রহমান বাপ্পী, নড়াইল জেলা বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
একটি কন্যাসন্তানের জন্ম যেখানে একটি পরিবারের আনন্দের সূচনা হওয়ার কথা ছিল, সেখানে চিকিৎসাগত অবহেলার কারণে আজীবন মাতৃত্বের সম্ভাবনা হারিয়ে চরম মূল্য দিতে হলো এক তরুণী মাকে। স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের এমন দায়িত্বহীনতার জবাবদিহি এখন নড়াইলবাসীসহ সব সচেতন নাগরিকের দাবি।