রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র মতিঝিল এবং সাভারে উদ্ধার হওয়া দুটি হাতে তৈরি শক্তিশালী বোমা বা ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) তৈরির নেপথ্যে বিদেশি কোনো নেটওয়ার্কের সরাসরি আর্থিক জোগান ছিল কি না, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছেন দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের চাঞ্চল্যকর দাবি, আন্তর্জাতিক কোনো মাধ্যম থেকে প্রেরিত বিদেশি অর্থ দেশীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হাতে এসে পৌঁছায় এবং সেই অর্থ ব্যবহার করেই বিস্ফোরক দুটি তৈরি করা হয়েছে। তবে এই অর্থ লেনদেনের সুনির্দিষ্ট রুট, প্রেরকের পরিচয় কিংবা স্থানান্তরিত অর্থের পরিমাণ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অপরাধীদের শনাক্ত ও পুরো চক্রান্তের রহস্য উদঘাটনে মাঠে নেমেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটসহ একাধিক এলিট গোয়েন্দা দল।
গোয়েন্দা অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ঝিমিয়ে পড়া পুরোনো উগ্রবাদী সংগঠনগুলো নিজেদের শক্তি প্রদর্শন ও অবস্থান জাহির করতেই অতি সম্প্রতি মতিঝিল ও সাভারের মতো ব্যস্ততম এলাকায় বিস্ফোরকগুলো বসিয়েছিল। বিশেষ করে জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), নব্য জেএমবি কিংবা আনসার আল ইসলামের মতো নিষিদ্ধ দলগুলোর পূর্বে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক থাকলেও, তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে পুরোনো একাধিক উগ্রবাদী প্ল্যাটফর্মের কয়েকজন সাবেক সদস্য একত্র হয়ে সম্পূর্ণ নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছে বলে মনে করছেন অনেকে। মূলত নিজেদের অস্তিত্ব ও উত্থানের বার্তা জানাতেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে লক্ষ্য করে এই কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে।
একটি গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, সংগৃহীত 'ফুট-প্রিন্ট' পর্যালোচনায় একদমই নতুন কোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর নাম সামনে আসছে। ফার্মগেট ও মিরপুর মেট্রো রেল স্টেশনের সাম্প্রতিক ভয়ভীতি ছড়ানোর ঘটনাগুলোতেও এদের কারসাজি থাকতে পারে। যদিও অন্য একটি সংস্থার মতে, নতুন নতুন কর্মী রিক্রুটমেন্টের চেয়ে পুরোনো উগ্রবাদীদের সমন্বয়ে গঠিত ভিন্ন নামের কোনো প্ল্যাটফর্মই এখানে কলকাঠি নাড়ছে।
মামলার ছায়া তদন্তে যুক্ত ডিএমপির সিটিটিসি নিশ্চিত করেছে, মতিঝিল ও সাভারের ঘটনা দুটি মূলত একই সূত্রে গাঁথা। এতে অন্তত ৪ থেকে ৫ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উগ্রবাদী সরাসরি যুক্ত ছিল, যারা কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে বোমা নির্দিষ্ট স্থানে রাখার দায়িত্ব পালন করেছে। উদ্ধার করা আইইডি বিস্ফোরণ ঘটানো তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল না, বরং জনমনে আতঙ্ক ছড়ানোই ছিল মূল কাজ। কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত রাসায়নিক কেমিক্যালগুলো সম্ভবত পুরান ঢাকার কেমিক্যাল মার্কেট, কোনো ল্যাবরেটরি কিংবা অলংকারের দোকান থেকে কোনো পেশাদার ছদ্মবেশে সংগ্রহ করা হয়েছে।
এদিকে, মতিঝিলের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কার্যকর সিসিটিভি ফুটেজ না পাওয়াকে চরম রহস্যজনক মনে করছেন তদন্তকারীরা। এটি কোনো পূর্বপরিকল্পিত নিরাপত্তা ফাঁকি কি না, সেটিও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখা হচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় ইতিমধ্যেই সারাদেশের মেট্রো স্টেশন, পুলিশের যানবাহন ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বিশেষ নিরাপত্তা জারি করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনা ও গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশ। অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।