ইউক্রেনের বিরুদ্ধে অবিনাশী সামরিক অভিযান পরিচালনা করা রাশিয়া থেকে খনিজ তেল ও জ্বালানি পণ্য আমদানিকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পথ উন্মুক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মস্কোর জ্বালানি ক্রয়ের অপরাধে ভারত ও চীনসহ এশিয়ার অন্তত পাঁচটি প্রভাবশালী দেশের পণ্যের ওপর ঢালাওভাবে ১০০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা প্রদান সংক্রান্ত একটি ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ বিল বিপুল সমর্থনে অনুমোদন করেছে মার্কিন আইনসভার উচ্চকক্ষ সিনেট।
বিশেষভাবে প্রণীত ‘রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’ শিরোনামের আলোচিত এই আইনপ্রণেতা খসড়াটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অন্যতম ঘনিষ্ঠ এবং বিশ্বখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মরহুম সিনেটর লিন্ডসে ও. গ্রাহাম কর্তৃক রচিত হয়েছিল। সদ্য প্রয়াত এই রাজনীতিকের উত্থাপিত বিলে নীতিগতভাবে বলা হয়— আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে যেসমস্ত রাষ্ট্র ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে আগ্রাসন চালানো ক্রেমলিনের যুদ্ধের সামরিক তহবিলে বিপুল অর্থ জুগিয়ে চলেছে, ওয়াশিংটন নিজেদের আইনি ও বাণিজ্যিক ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সব ধরণের মার্কিন রপ্তানি চালানের ওপর সরাসরি ১০০ শতাংশ হারে চরম শাস্তিমূলক বাণিজ্য শুল্ক কার্যকর করতে পারবে।
শুক্রবার মার্কিন জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষে চূড়ান্ত ভোটাভুটির প্রাক্কালে শতদলীয় সিনেটের ১০০ জন আইনপ্রণেতার মধ্যে রেকর্ডসংখ্যক ৮৬ জন সদস্য খসড়া বিলটির সপক্ষে অবস্থান নিয়ে রায় প্রদান করেন। মাত্র ১১ জন সিনেটর প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেন এবং ৩ জন সদস্য ভোটদান প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকেন। বড় ধরনের দলমত নির্বিশেষে পাস হওয়া এই প্রস্তাবটি এখন আগামী ৩১ আগস্ট হতে শুরু হতে যাওয়া মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ ‘হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস’ বা প্রতিনিধি পরিষদের বিশেষ অধিবেশনে পাসের উদ্দেশ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নিম্নকক্ষেও যদি বিলটি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় অনুমোদিত হয়, তবে চূড়ান্ত স্বাক্ষরের নিমিত্তে এটি সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওভাল অফিসে পৌঁছে যাবে। ট্রাম্প দপ্তরের স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংক্রান্ত এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বাধ্যবাধকতামূলক বিধিনিষেধ আইনে পরিণত হবে। এই আইন বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক বৈশ্বিক চালচিত্রে রাশিয়া থেকে তেল কেনা চীন ও ভারতের পাশাপাশি মারাত্মক অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে নিক্ষিপ্ত হবে ইউরোপ ও এশিয়ার আরও তিন জ্বালানি-নির্ভর রাষ্ট্র— আজারবাইজান, হাঙ্গেরি এবং স্লোভাকিয়া। কারণ রাশিয়া-ইউক্রেন সামরিক সংঘাত চলাকালীনও মস্কোর জ্বালানির ওপর এই তিনটি দেশের সরাসরি নির্ভরশীলতা পুরোপুরি বজায় ছিল।
পাস হওয়া প্রস্তাবিত বিধিনিষেধে রাশিয়ার খনিজ তেলের বৃহৎ ক্রেতা দেশগুলোর আমদানিকৃত পণ্যে শতভাগ কর ধার্যের পাশাপাশি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, তাঁর ঘনিষ্ঠ ধনকুবের অলিগার্ক শ্রেণী এবং একাধিক রুশ জাতীয় অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন করে অবরোধের বিধান রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সামরিক শক্তি ইরানের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ওপর বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা ২০৩১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করার রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়েছে।
গত ১১ জুলাই ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ সফরকালে আকস্মিক প্রয়াত হওয়া সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের সফরসঙ্গী ডেমোক্রেটিক পার্টির জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা রিচার্ড ব্লুমেন্থাল ভোটাভুটি শেষে ক্ষোভ ও আবেগঘন কণ্ঠে সাংবাদিকদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, মুক্তিকামী স্বাধীন মানুষের ওপর চলা নারকীয় আগ্রাসনের মদদদাতাদের অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার এই উদ্যোগ গ্রাহামের আজীবনের আকাঙ্ক্ষারই এক গৌরবোজ্জ্বল মাইলফলক। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি ও ভারতের শীর্ষ গণমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে, সিনেটে ঐতিহাসিক বিলটি গৃহীত হওয়ার পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্য ও উদীয়মান এশীয় অর্থনীতিগুলোর বাণিজ্য প্রবাহে নতুন ধরনের বড় ধাক্কা আসতে যাচ্ছে।