দীর্ঘ ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট ক্রিকেটে স্বাগতিকদের মুখোমুখি হয়ে বল হাতে এক দুর্দান্ত শুরুর সূচনা করেছে বাংলাদেশ দল। অস্ট্রেলিয়ার ডারউইনে অনুষ্ঠিত এই বহুল কাঙ্ক্ষিত ও ঐতিহাসিক টেস্ট ম্যাচে শুরুতেই সবুজ ঘাসের পিচ ও প্রতিকূল কন্ডিশনকে কাজে লাগিয়ে স্বাগতিক ব্যাটারদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছেন লাল-সবুজের পেসাররা। বিশেষ করে, ডানহাতি তরুণ গতি তারকা হাসান মাহমুদের দুর্দান্ত সুইং ও নিখুঁত লাইন-লেংথের বোলিং তোপে পড়ে চরম বিপাকে পড়েছে অসিদের শক্তিশালী উদ্বোধনী জুটি। নিয়ন্ত্রিত পেস ও সুইংয়ের চমৎকার মিশেলে একাই দুই অসি ওপেনারকে প্যাভিলিয়নের পথ দেখিয়ে ম্যাচে বাংলাদেশকে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে এনে দিয়েছেন হাসান।
ম্যাচের শুরুতেই টস জিতে প্রথমে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নেন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স। নিজেদের চেনা কন্ডিশনে বড় সংগ্রহ গড়ে প্রতিপক্ষকে চেপে ধরাই ছিল স্বাগতিকদের মূল লক্ষ্য। তবে নতুন লাল বল হাতে অস্ট্রেলীয় ব্যাটারদের সেই পরিকল্পনা বানচাল করে দেন বাংলাদেশের দুই প্রধান পেস অস্ত্র হাসান মাহমুদ ও তাসকিন আহমেদ। ইনিংসের প্রথম থেকেই উইকেটের দুই প্রান্ত ধরে বল হাতবদল করে একের পর এক বিষাক্ত ডেলিভারিতে ওপেনারদের সার্বক্ষণিক কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেন এই দুজন। বিশেষ করে হাসান মাহমুদ উইকেটের দুই দিকেই সুইং করিয়ে অসি ব্যাটার ট্রাভিস হেড ও জ্যাক ওয়েদারল্ডকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলে দেন।
হাসানের করা ইনিংসের তৃতীয় ওভারেই প্রথম সাফল্য পেতে পারত বাংলাদেশ। তাঁর চমৎকার এক আউটসুইঙ্গারে বিভ্রান্ত হয়ে শট খেলতে গিয়ে আকাশে ক্যাচ তুলে দিয়েছিলেন বিপজ্জনক ওপেনার ট্রাভিস হেড। কিন্তু ভাগ্যের জোর ও বল ফিল্ডারের নাগালের বাইরে ড্রপ করায় নিরাপদ স্থানে গিয়ে পড়ে, ফলে সে যাত্রায় বেঁচে যান হেড। সুযোগ হাতছাড়া হলেও মনোবল না হারিয়ে উইকেটে দুই দিকেই ক্রমাগত বল সুইং করিয়ে অসিদের ওপর চাপ অব্যাহত রাখেন হাসান মাহমুদ।
অবশেষে হাসানের এই অসাধারণ ও আক্রমণাত্মক বোলিংয়ের কাঙ্ক্ষিত ফল আসে ম্যাচের ১২তম ওভারে। অফ স্টাম্পের বেশ বাইরের দিকে বেরিয়ে যাওয়া এক লোভনীয় ডেলিভারিতে ড্রাইভ করতে গিয়ে ফাঁদে পড়েন অস্ট্রেলিয়ার উদ্বোধনী ব্যাটার জ্যাক ওয়েদারল্ড। ব্যাটের পরাস্ত কানায় লেগে বল সোজা চলে যায় উইকেটের পেছনে। সেখানে কোনো ভুল না করে চমৎকার দক্ষতার সঙ্গে বলটি তালুবন্দি করেন উইকেটরক্ষক লিটন কুমার দাস। দলীয় ৪৫ রানের মাথায় প্রথম সাফল্য লাভ করে বাংলাদেশ শিবির।
প্রথম উইকেটের পতনের পর রানের ওপর থেকে চাপ সরাতে স্বাভাবিক আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের পথে হাঁটতে চেয়েছিলেন অন্য ওপেনার ট্রাভিস হেড। ১৪তম ওভারে হাসান মাহমুদের প্রথম দুই বলেই আক্রমণাত্মক শট খেলে ছয় রান আদায় করে নেন তিনি। তবে হাসানের চমৎকার বুদ্ধিমত্তার কাছে সেই আক্রমণ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ওই ওভারেরই তৃতীয় বলটি অফ স্টাম্পের বাইরে ফেলে কিছুটা ভেতরের দিকে হালকা সুইং করান হাসান। গতির তারতম্য ও সুইং বুঝতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে ব্যাট চালিয়ে দেন হেড। বলটি অসি তারকার ব্যাটের ভেতরের কানায় হালকা স্পর্শ করে সজোরে আছড়ে পড়ে স্টাম্পের ওপর এবং সাথে সাথে উড়ে যায় বেল। এতে করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অন্যতম বিধ্বংসী ব্যাটার ট্রাভিস হেডকে বোল্ড করে অসি শিবিরে দ্বিতীয় আঘাত হানেন হাসান।
হাসান মাহমুদের এই জোড়া আঘাতে মাত্র ৫২ রানেই ২ উইকেট হারিয়ে বেশ চাপে পড়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। প্রথম সেশনেই স্বাগতিকদের জোড়া ধাক্কা দিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার ইঙ্গিত দেয় বাংলাদেশ। গতি, সুইং ও বাউন্সের চমৎকার প্রদর্শনীতে হাসান ও তাসকিনের উদ্বোধনী স্পেলটি পুরো বাংলাদেশ দলকে এক নতুন উদ্দীপনায় ভাসায়।
দীর্ঘ ২৩ বছরের ব্যবধানের পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলার সুযোগ পাওয়া বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই ঐতিহাসিক ম্যাচে জাতীয় দলের একাদশে রাখা হয়েছে তিন প্রধান পেসার ও এক স্পিনারকে। বাংলাদেশের একাদশে রয়েছেন তানজিদ হাসান তামিম, সাদমান ইসলাম, মুমিনুল হক, অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত, অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিম, উইকেটরক্ষক লিটন কুমার দাস, মেহেদী হাসান মিরাজ, তাইজুল ইসলাম, তাসকিন আহমেদ, এবাদত হোসেন ও হাসান মাহমুদ। অন্যদিকে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার একাদশে স্থান পেয়েছেন ট্রাভিস হেড, জ্যাক ওয়েদারল্ড, মারনাস লাবুশেন, স্টিভেন স্মিথ, ক্যামেরন গ্রিন, উইকেটরক্ষক অ্যালেক্স ক্যারি, ব্যু ওয়েবস্টার, অধিনায়ক প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক, নাথান লায়ন ও জশ হ্যাজলউড।