ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে কঠোর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের মার্কিন হুমকির জবাবে সরাসরি সামরিক পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার জোরালো হুশিয়ারি ব্যক্ত করেছে তেহরান। বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শুক্রবার ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে ওয়াশিংটন থেকে কোনো নতুন সামরিক বা কূটনৈতিক হুমকি এলে তার জবাব দেওয়া হবে অত্যন্ত বিধ্বংসী ও ভয়াবহ উপায়ে।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল আলী আবদোল্লাহি বর্তমান উত্তপ্ত পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর স্থল, সমুদ্র, আকাশ, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং আধুনিক সাইবার সক্ষমতা পুরোপুরি প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে। শত্রুপক্ষের পক্ষ থেকে নতুন করে কোনো হুমকি বা উসকানিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হলে তার বিপরীতে কঠোর, শাস্তিমূলক এবং বিধ্বংসী জবাব দেওয়া হবে বলে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটির সঙ্গে যেকোনো ধরনের বাণিজ্যিক লেনদেন বা আর্থিক সহায়তা অব্যাহত রাখা বিশ্বের অন্য দেশগুলোর বিরুদ্ধেও কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার সরাসরি হুমকি প্রদান করেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানান, আগামী সোমবার নতুন এই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত রূপরেখা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে। মূলত ওয়াশিংটনের প্রধান লক্ষ্য হলো বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিধিনিষেধের মাধ্যমে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে চরম চাপের মুখে ফেলা।
তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে টানা নিষেধাজ্ঞার হুমকি প্রদান করা হলেও, ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতার কথা খোলামেলা স্বীকার করেছেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তিনি মন্তব্য করেন, কেবল সামরিক সক্ষমতা ও শক্তিমত্তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা সম্ভব নয়; বরং দেশের সাধারণ মানুষের খাবার নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা, অর্থের অবাধ প্রবাহ এবং অভ্যন্তরীণ জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করাও একইভাবে জরুরি।
এদিকে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া এই কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে। নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে ইতোমধ্যে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বজুড়ে ইরানের সঙ্গে নিয়মিত বাণিজ্য পরিচালনা করা দেশগুলোর ওপর আমেরিকান প্রশাসন চাপ বৃদ্ধি করলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল সরবরাহ ব্যবস্থা আরও মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
উল্লেখ্য, ইরানের খনিজ তেল রপ্তানির সবচেয়ে বড় ক্রেতা দেশ হলো চীন। ফলে স্বভাবতই বেজিংয়ের ওপর চাপ প্রয়োগ বাড়াতে পারে আমেরিকান নীতিপ্রণেতারা। তবে এই বিষয়ে চিনের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে জানানো হয়েছে যে, যেকোনো দেশের ওপর অন্যায্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি কোনো সমস্যার টেকসই সমাধান আনে না, বরং সকল বৈরী পরিস্থিতি কূটনীতির মাধ্যমেই সমাধান করা উচিত।
অন্যদিকে সামরিক ও ভৌগোলিক গুরুত্বসম্পন্ন হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পূর্বে দুবার যুদ্ধবিরতির সমঝোতা হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে বাস্তবতা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি। উল্লেখ্য, বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য হওয়া মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই কৌশলগত নৌপথ দিয়ে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা ও জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে নেটো বা উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোটের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার জেনারেল অ্যালেক্সাস গ্রিনকেভিচ তাঁর মিত্রদেশগুলোর সামরিক বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে বিশেষ ভিডিও বৈঠক সম্পাদন করেছেন। নেটোর পক্ষ থেকে পরিষ্কারভাবে জানানো হয়েছে যে, এটি জোটগত কোনো সামরিক অভিযান নয়, তবে কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার উপায় নিয়ে মূলত এই ফলপ্রসূ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।