বরিশাল নগরীর বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের অন্যতম প্রধান বাহনে পরিণত হয়েছে ব্যাটারিচালিত হলুদ অটোরিকশা ও রিকশা। তবে কোনো প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ, ড্রাইভিং লাইসেন্স কিংবা কার্যকর প্রশাসনিক অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা না থাকায় প্রতিনিয়ত অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়ছে এসব যানবাহনের সংখ্যা। এর ফলে নগরীর বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় তৈরি হচ্ছে নজিরবিহীন চাপ। চরম উদ্বেগের বিষয় হলো—নগরীতে ঠিক কতটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও রিকশা চলাচল করছে, তার নির্ভরযোগ্য বা নিখুঁত কোনো পরিসংখ্যান নগরীর কোনো সরকারি দপ্তরের কাছেই নেই।
বরিশাল মহানগর ট্রাফিক পুলিশের প্রাথমিক সম্ভাব্য হিসেব অনুযায়ী, বর্তমানে নগরজুড়ে প্রায় ৩০ হাজার হলুদ অটোরিকশা এবং প্রায় ৪০ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়মিত চলাচল করছে। অথচ বরিশাল সিটি করপোরেশন থেকে অতীতে মাত্র ৭ হাজার ৬১০টি হলুদ অটোরিকশার সাময়িক অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে সেসব অনুমোদনের মেয়াদ বহুকাল আগেই উত্তীর্ণ হয়ে গেছে এবং নতুন করে তা নবায়নের কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ওয়েস্ট জোনের (ওজোপাডিকো) বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মঞ্জুরুল ইসলাম জানান, তাঁর আওতাধীন এলাকায় ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার গ্যারেজের প্রকৃত সংখ্যা তাঁদের জানা নেই। শুধু বাণিজ্যিক গ্যারেজই নয়, নগরীর বিভিন্ন বাসাবাড়িতেও অননুমোদিতভাবে গ্যারেজ বানিয়ে ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হচ্ছে। এসব অবৈধ কার্যকলাপ বন্ধে কার্যকর কৌশল খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আরও জানান, একটি অটোরিকশার ব্যাটারি একবার পূর্ণ চার্জ করতে প্রায় ১০ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয় এবং অনেকেই দিনে দুইবার চার্জ দিয়ে থাকেন। সেই হিসেবে দিনে যানপ্রতি গড়ে ২০ ইউনিট বিদ্যুৎ অপচয় বা ব্যবহৃত হচ্ছে।
হিসেব অনুযায়ী, প্রতিটি যান একবার চার্জে ১০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করলেও বরিশালের প্রায় ৭০ হাজার ব্যাটারিচালিত যানের জন্য দিনে অন্তত ৭ লাখ ইউনিট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। প্রতি ইউনিট ১৪ টাকা ৫০ পয়সা বাণিজ্যিক দর হিসেব করলে এর দৈনন্দিন আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা। বিদ্যুৎ বিভাগের নথিপত্র অনুযায়ী, নগরীতে বর্তমানে মাত্র ১২৭টি ব্যাটারি চার্জিং গ্যারেজে বাণিজ্যিক মিটার রয়েছে। কিন্তু বাণিজ্যিক মিটারহীন অবৈধ ও অননুমোদিত গ্যারেজের সংখ্যা প্রায় ২০০ ছাড়িয়ে গেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব গ্যারেজের বেশিরভাগটিতেই চতুরতার সাথে আবাসিক সংযোগ ব্যবহার করা হচ্ছে, আবার কোথাও বিদ্যুতের প্রধান সরবরাহ লাইন থেকে সরাসরি হুকিং করে অবৈধভাবে ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হচ্ছে। স্টেডিয়াম কলোনি এলাকার এক গ্যারেজ মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বীকার করেন যে, লাইন কেটে দেওয়া এড়াতে বিদ্যুতের স্থানীয় অসাধু কর্মচারীদের প্রতি মাসে নির্দিষ্ট অংকের টাকা দিতে হয়। একই সাথে বিসিক এলাকার আরেক গ্যারেজ মালিক জানান, রাত ১টার পর তাঁরা বিদ্যুৎ খরচ বাঁচাতে সরাসরি মেইন লাইনে হুকিং করে ব্যাটারি চার্জ দেন এবং মাঝেমধ্যে মিটার রিডারকেও টাকা দিতে হয়।
অবশ্য অননুমোদিত ও অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিরুদ্ধে নিয়মিত তদারকি চালিয়ে গত ছয় মাসে মোট ৬৮১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় বিদ্যুৎ দপ্তর। পরিচালিত এসব অভিযানে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায়সহ তিনজনকে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। ওজোপাডিকোর বরিশাল সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পরিতোষ চন্দ্র সরকার বলেন, বরিশাল শহরের ভৌগোলিক আয়তনের তুলনায় যানবাহনের এই সংখ্যা অপ্রতুল ও অতিরিক্ত। ব্যাটারিচালিত যান চার্জিংয়ে যেকোনো ধরনের অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বা চুরির প্রমাণ মিললে জিরো টলারেন্স নীতিতে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।