নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের ঐতিহাসিক ‘বড় সরদার বাড়ি’তে বাণিজ্যিক শুটিংয়ের কারণে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ও প্রশাসনিক নানা অনিয়ম-দুর্নীতি, কারুপল্লীতে প্রকৃত কারুশিল্পীদের বঞ্চিত করে অনিয়মের মাধ্যমে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছে ‘সোনারগাঁয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটি’।
শনিবার (২৯ আগস্ট ২০২৬) নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব মারাত্মক অভিযোগ ও একাধিক দাবি তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনটির আহ্বায়ক, বিশিষ্ট কবি ও প্রাবন্ধিক শাহেদ কায়েস। এতে বক্তব্য রাখেন দেশের খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি। এ সময় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক কবি রহমান মুজিব, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সহ-সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল এবং সোনারগাঁও সাহিত্য নিকেতনের শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক লেখক মোয়াজ্জেনুল হকসহ স্থানীয় অন্যান্য গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
‘কোক স্টুডিও বাংলা’র শুটিংয়ে ক্ষতির অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দীর্ঘ দিন জরাজীর্ণ ও ভগ্নদশায় থাকার পর ঐতিহাসিক বড় সরদার বাড়ির পুনরুদ্ধার কাজ ২০১২ সালে শুরু হয়ে ২০১৭ সালে সমাপ্ত হয়। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে অনন্য এই প্রত্নভবনটি সাধারণ দর্শনার্থীদের দর্শনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করা হয়।
সংগঠনটির অভিযোগ, সম্প্রতি এই ঐতিহাসিক ভবনের সংবেদনশীল চত্বরে টানা চার দিন ধরে ‘কোক স্টুডিও বাংলা সিজন ৪’-এর মিউজিক ভিডিও ধারণ ও বহুজাতিক সংস্থা কোকা-কোলার বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের দৃশ্যধারনের কাজ করা হয়েছে। শুটিং চলাকালে ভারী ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ডাবল-ডিজেল জেনারেটর, অতিমাত্রার আলোকসজ্জা, সাউন্ড সিস্টেম ও ভারী ক্যামেরা সরঞ্জাম ব্যবহারের কারণে শতবছরের প্রাচীন ভবনটির বিভিন্ন অংশে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। শুটিং শেষে ভবনের নান্দনিক দেয়াল, প্রাচীন অলংকরণ ও নকশার বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি লক্ষ্য করা গেছে এবং দ্বিতীয় আঙিনার কাছে একটি স্থাপত্য অংশ ভেঙে পড়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।
এ সময় আয়োজকরা প্রশ্ন তোলেন—বাণিজ্যিক শুটিংয়ের অনুমতি দেওয়ার আগে ভবনটির ওপর কোনো ‘হেরিটেজ ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট’ (ঐতিহ্য প্রভাব মূল্যায়ন) করা হয়েছিল কি না? পাশাপাশি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমোদন ও সুস্পষ্ট মতামত ছিল কি না, তা জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানানো হয়। এ ছাড়া বাণিজ্যিক শুটিংয়ের আনুষ্ঠানিক অনুমতিপত্র, আর্থিক লেনদেনের হিসাব এবং শুটিংয়ের আগে ও পরের নথিপত্র প্রকাশের তাগিদ দেওয়া হয়।
কারুপল্লীর দোকান বরাদ্দে ভয়াবহ অনিয়ম
সংবাদ সম্মেলনে সোনারগাঁও জাদুঘরের ঐতিহ্যবাহী কারুপল্লীর দোকান বরাদ্দ নিয়েও বিস্তর দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়। সংগঠনটি দাবি করে, প্রকৃত লোক ও কারুশিল্পীদের দোকান পেছনের সারিতে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে ১ নম্বর গেট ও পার্কিং এলাকার মতো সুবিধাজনক স্থানে মোটা অঙ্কের অনৈতিক আর্থিক বিনিময়ে অপ্রাসঙ্গিক ব্যক্তিদের দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যাদের বড় একটি অংশ মূল কারুশিল্পের সাথে যুক্ত নন। এ কারণে দোকান বরাদ্দের বিদ্যমান নীতিমালা, বরাদ্দপ্রাপ্তদের পরিচয় ও এর পেছনের আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত চাওয়া হয়।
পরিচালকসহ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ফিরিস্তি
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালক কাজী মাহবুবুল আলম, সহকারী পরিচালক মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং গাইড লেকচারার আশরাফুল আলম নয়নের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়। উন্মুক্ত দরপত্র বা টেন্ডার ছাড়াই প্রায় অর্ধকোটি টাকার মেলা ও অনুষ্ঠান আয়োজন, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, অনুমোদনহীন ৩ কোটি টাকার বেশি ব্যয় প্রদর্শন, মেরামতকাজে অতিরিক্ত বিল তৈরি এবং ভুয়া শ্রমিক দেখিয়ে টাকা তোলার অভিযোগ করা হয়। তবে এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিক বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
ঐতিহ্য সুরক্ষায় ১২ দফা দাবি
চিত্রশিল্পী রফিউর রাব্বি ও আহ্বায়ক শাহেদ কায়েস বলেন, শতাব্দী প্রাচীন প্রত্নসম্পদ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত করা হলে হাজার কোটি টাকা খরচ করেও সেই ইতিহাস আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। সংবাদ সম্মেলন থেকে ১২ দফা দাবি ঘোষণা করা হয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
১. অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় বা স্বাধীন নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন।
২. শুটিংয়ের অনুমোদন সংক্রান্ত নথি ও অর্জিত অর্থ নিরীক্ষা করা।
৩. সংরক্ষণ স্থপতি ও প্রত্নতত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের দ্বারা ভবনের জরুরি কারিগরি পরিদর্শন।
৪. যেকোনো প্রত্নস্থাপনায় শুটিংয়ের আগে ‘হেরিটেজ ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট’ বাধ্যতামূলক করা।
৫. কারুপল্লীর দোকান বরাদ্দের তালিকা প্রকাশ ও প্রকৃত শিল্পীদের সুবিধাজনক স্থান বরাদ্দ প্রদান।