অবসরের পর সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের সাধারণ পাসপোর্টের জন্য নতুন করে গোয়েন্দা সংস্থা বা পুলিশের ভেরিফিকেশনের মুখোমুখি করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলীর পাসপোর্ট সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে দায়ের করা এক রিট আবেদনের শুনানি শেষে গঠিত রুল নিষ্পত্তি করে বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় প্রদান করেন। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে পূর্ণাঙ্গ এই রায় প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রদত্ত রায়ে উচ্চ আদালত আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলীসহ সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত সকল বিচারক এবং তাঁদের স্ত্রীদের কোনো ধরনের অতিরিক্ত গোয়েন্দা ভেরিফিকেশন কিংবা প্রশাসনিক প্রক্রিয়াগত বিলম্ব ছাড়াই সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যু করে তা হস্তান্তরের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন। রায়ের রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব তুলে ধরে আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, বিচারক পদে দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্র তাঁদের সর্বোচ্চ মর্যাদা ও সামাজিক পরিচয় যথাযথভাবে যাচাই করেই কূটনৈতিক বা বিশেষ পাসপোর্ট দিয়ে থাকে। ফলে বিচারিক জীবন থেকে অবসর গ্রহণের পর কেবল সাধারণ নাগরিক পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য তাঁদের পুনরায় নতুন করে গোয়েন্দা ভেরিফিকেশনের মুখোমুখি করা প্রশাসনিকভাবে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন।
আদালতে পেশ করা রিট আবেদনের নথি থেকে জানা যায়, রাষ্ট্রীয় বিধান ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স’ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের সম্মানিত বিচারক ও তাঁদের স্ত্রীগণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কূটনৈতিক পাসপোর্টের অধিকার লাভ করেন। সাংবিধানিক বিচারকের পদ থেকে অবসর গ্রহণ কিংবা পদত্যাগের পর সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক পাসপোর্ট সমর্পণ করে সাধারণ পাসপোর্টের জন্য প্রশাসনিক নিয়ম মেনে আবেদন করতে হয়। অতীতে নিয়মিত নিয়ম অনুসারে এসব সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যুর ক্ষেত্রে বাড়তি কোনো গোয়েন্দা প্রতিবেদনের প্রয়োজনীয়তা ছিল না।
তবে পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট একটি বিশেষ প্রশাসনিক স্মারক জারি করে। ওই স্মারকে বলা হয়, কূটনৈতিক পাসপোর্ট সমর্পণকারী ব্যক্তিদের সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যু করার পূর্বে দুটি পৃথক গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে সন্তোষজনক প্রতিবেদন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ফলে সরাসরি ভোগান্তির শিকার হন আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী। তিনি নিয়ম মেনে নিজ কূটনৈতিক পাসপোর্ট সমর্পণ করে ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর নতুন সাধারণ পাসপোর্টের আবেদন করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘদিন পার হলেও গোয়েন্দা ক্লিয়ারেন্স না পাওয়ার অজুহাতে তাঁকে পাসপোর্ট হস্তান্তর করা হয়নি, যার ফলে তিনি জরুরি বিদেশ ভ্রমণে সরাসরি বাধাগ্রস্ত হন।
উদ্ভূত এই পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের অনুমতিক্রমে হাইকোর্ট বিভাগের প্রোটোকল অফিসার মো. রোমান ভূঁইয়া প্রশাসনিক এই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করেছিলেন। রিটের পর প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট সংশ্লিষ্টদের প্রতি রুল জারি করেন। পরবর্তীতে দীর্ঘ আইনগত শুনানি ও যুক্তিতর্ক পর্যালোচনা শেষে সেই রুল নিষ্পত্তি করে বৃহস্পতিবার এই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হলো।