জামালপুর প্রতিনিধি
মেয়ের বিয়ের দিন-তারিখ ও উপহার সামগ্রী ঠিক করতে জমি বিক্রির নগদ পাঁচ লাখ টাকা সঙ্গে নিয়ে জামালপুর থেকে গাজীপুরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন ইসমাইল হোসেন (৪৯)। কথা ছিল গাজীপুরের জিরানী এলাকায় গিয়ে ছেলের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিয়ের সব প্রস্তুতি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন করবেন।
কিন্তু সেই গন্তব্যে আর পৌঁছানো হয়নি তাঁর। পথিমধ্যে গণপরিবহনের চালক ও সহকারীদের নির্মম নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে প্রাণ হারাতে হয়েছে তাঁকে। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী অংশ থেকে তাঁর মুখ ও হাত স্কচটেপে পেঁচানো নিথর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মর্মান্তিক এই হত্যাকাণ্ডের পর নিহত ইসমাইলের সঙ্গে থাকা জমি বিক্রির নগদ পাঁচ লাখ টাকা এবং দুটি মোবাইল ফোনও ছিনিয়ে নেয় ঘাতকরা।
হৃদয়বিদারক এই ঘটনার পর নিহতের গ্রামের বাড়ি জামালপুর সদর উপজেলার দিগপাইত ইউনিয়নের হবদেশ গ্রামে এখন চলছে স্বজনদের অঝোর কান্না। অভাব-অনটনের সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ও প্রধান আশ্রয়স্থল ইসমাইলকে হারিয়ে পুরো পরিবার এখন দিশেহারা। পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে প্রায় চার বছর আগে সপরিবারে গাজীপুরে গিয়ে ডেল্টা স্পিনিং মিলসে নিরাপত্তা প্রহরীর চাকরি শুরু করেছিলেন ইসমাইল হোসেন।
পরবর্তীতে শারীরিক অসুস্থতার কারণে চাকরি ছেড়ে চার মাস আগে জামালপুরের গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসেন তিনি। সম্প্রতি স্থানীয় এক যুবকের সঙ্গে তাঁর মেয়ে শারমিন আক্তারের বিয়ে ঠিক হয়। মেয়ের বিয়ে দেওয়া ও আগের ঋণ পরিশোধ করতে তিনি নিজ বসতবাড়ির ১০ শতাংশ জমি ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করেন। ঋণ শোধের পর অবশিষ্ট পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে মেয়ের বিয়ের তারিখ নির্ধারণের উদ্দেশ্যে গত ৪ সেপ্টেম্বর ভোরে জামালপুরের দিগপাইত বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে ওঠেন ইসমাইল।
যাত্রাপথে ‘রাজ ক্লাসিক’ নামের বাসটিতে ইসমাইল হোসেন ভাড়া দেওয়ার সময় লুঙ্গির কোঁচড় থেকে টাকা বের করলে বাসের সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমনের নজরে তা পড়ে। মোটা অঙ্কের টাকা দেখে তিনি বাসচালক সোহেল রানা ও সহকারী মো. মনির হোসেনের সঙ্গে ইসমাইলকে লুটে নেওয়ার গোপন পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সাধারণ যাত্রীদের গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে নামিয়ে দেওয়া হলেও ইসমাইলকে নামতে না দিয়ে বাসে জিম্মি করা হয়। পরবর্তীতে বাসের ভেতরেই তাঁর দুই হাত, নাক ও মুখ স্কচটেপ দিয়ে শক্ত করে পেঁচিয়ে গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করা হয়। ইসমাইলের মৃত্যু নিশ্চিত করে মরদেহ এক্সপ্রেসওয়ের বনানী অংশে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায় ঘাতকরা।
পরবর্তীতে সিসিটিভি ফুটেজ ও তথ্যপ্রযুক্তি পর্যালোচনা করে ঢাকা মহানগর পুলিশের একটি দল মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে সন্দেহভাজন বাসটি জব্দসহ চালক সোহেল রানা, সুপারভাইজার সাজু এবং হেলপার মনিরকে গ্রেপ্তার করে। এই ঘটনায় নিহতের ছেলে হাসান বাদী হয়ে বনানী থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মর্মান্তিক এই ঘটনায় বাকরুদ্ধ নিহতের মেয়ে শারমিন কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “বাবা বাসে ওঠার পর ফোন করে জানতে চেয়েছিলেন আমার জন্য কী আনবেন। আমি বলেছিলাম, ‘তুমি আগে আসো, তারপর বলব কী খাব’। কিন্তু নতুন জীবনে পা দেওয়ার আগেই ঘাতকরা আমার বাবাকে কাড়িয়া নিল।” নিহতের পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।