ঋতু পরিবর্তনের আবহাওয়া বইতেই কুষ্টিয়ার হাসপাতালগুলোতে নানা ধরনের শারীরিক জটিলতা নিয়ে শিশুদের উপস্থিতির হার লক্ষণীয়ভাবে বেড়ে গেছে। আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে শিশু রোগীদের জ্বর, ঠান্ডা-কাশি, ডায়রিয়া এবং ত্বকে ছোট ছোট র্যাশের মতো অসুস্থতা নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভিড় জমাতে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলার বিভিন্ন হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডগুলোতে ডেঙ্গু, ডায়রিয়া ও সংক্রামক হাম রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা নেওয়ার হার বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে বর্তমানে রোগীর অতিরিক্ত ভিড় পূর্বের তুলনায় সামান্য কমেছে, তবুও সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে চিকিৎসকরা অভিভাবকদের বাড়বাড়ন্ত সতর্কতা অবলম্বনের তাগিদ দিয়েছেন।
হাসপাতালে আসা অনেক অভিভাবকের দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী জানা যায়, শিশুদের প্রতি সাময়িক অসতর্কতা, সঠিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি এবং অসুস্থতার শুরুতেই সঠিক সময়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন না হওয়ার কারণে শিশুদের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং জটিলতা বাড়ে। তবে হাসপাতালে আসার পর প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা পেয়ে শিশুরা তুলনামূলক দ্রুত সময়ের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠে ঘরে ফিরছে বলেও জানান রোগীদের স্বজনেরা।
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান ডা. মাসুদা পারভীন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জানান, বর্তমানে হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা কিছুটা কম থাকলেও সামনের দিনগুলোতে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৫ জন করে নতুন শিশু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বর্তমানে শিশুদের মাঝে সংক্রামক হামের প্রাদুর্ভাব কিছুটা বৃদ্ধি পেতে দেখা যাচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করে পরামর্শ দিয়ে বলেন, কোনো শিশুর শরীরে হামের লক্ষণ দেখা দিলে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে পরিবার ও অন্যান্য শিশুদের থেকে আলাদা বা আইসোলেশনে রাখতে হবে। এছাড়া হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সঙ্গে অতিরিক্ত লোক বা এটেনডেন্ট আসা বন্ধ করা গেলে এ জাতীয় সংক্রামক রোগের বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. ইকবাল হাসান পরিস্থিতি সম্পর্কিত হালনাগাদ তথ্যে জানান, বর্তমানে তাঁদের হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে মোট ১৫ জন রোগী সরাসরি চিকিৎসাধীন রয়েছে এবং গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে নতুন করে আরও ৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। এছাড়া হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে বর্তমানে ৫ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে। তিনি আরও জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে উন্নত চিকিৎসার তাগিদে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে মোট ২ জন ডেঙ্গু রোগীকে স্থানান্তরিত বা রেফার করা হয়েছে।
হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্স ও চিকিৎসকদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ছোঁয়াচে রোগ। ফলে কোনো শিশু এই রোগে আক্রান্ত হলে তাকে পরিবারের সুস্থ শিশুদের সংস্পর্শ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক রাখা জরুরি। আক্রান্ত শিশুর শরীরে অতিরিক্ত জ্বর, অ্যালার্জির মতো র্যাশ, শ্বাসকষ্ট, ঘন ঘন বমি কিংবা ডায়রিয়ার দরুন পানিশূন্যতার প্রাথমিক লক্ষণ পরিলক্ষিত হলে বিন্দুমাত্র দেরি না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষ করে শিশু হামে আক্রান্ত হলে তাকে আলাদা রাখা এবং শরীরে লালচে দাগ বা র্যাশ ফোটার পর অন্তত চার দিন পর্যন্ত অন্য শিশুদের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু, ডায়রিয়া ও হাম—এই তিন ব্যাধির আক্রমণের ধরন ভিন্ন হলেও প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে রয়েছে সঠিক সচেতনতার ওপর। ডেঙ্গুর হাত থেকে বাঁচতে চারপাশের জমে থাকা পানি পরিষ্কার রেখে মশার বংশবিস্তার রোধ করা এবং মশার কামড় থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে, হামের মতো মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ প্রতিরোধে শিশুদের সঠিক সময়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনা জরুরি। এছাড়া ডায়রিয়া এড়াতে সার্বক্ষণিক বিশুদ্ধ পানি পান করা, খাওয়ার পূর্বে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার স্বাস্থ্যকর অভ্যাস এবং টাটকা খাদ্য গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুর পানিশূন্যতা রোধে খাওয়ার স্যালাইন বা ওআরএস অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। তবে শিশুর চোখ বসে যাওয়া, মাত্রাতিরিক্ত দুর্বলতা দেখা দেওয়া, তরল পানি খেতে না পারা কিংবা বার বারবার বমি হওয়ার মতো সংকটজনক লক্ষণ দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে শিশুকে নিকটস্থ হাসপাতালে ভর্তি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংক্রামক ব্যাধির বিস্তার রোধে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মাধ্যমে ঋতু বদলের এই সময়ে শিশুদের সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।