ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ইন্দোনেশিয়ায় ২৪০ যাত্রী নিয়ে জাহাজ নিখোঁজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আটক ২ কমলা হ্যারিসের বাড়িতে অনধিকার প্রবেশের চেষ্টা, পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার রাজধানীতে সকালের বৃষ্টিতে সড়কে ভোগান্তি, ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস ইয়েমেনে ফের তীব্র সংঘাত, ১২৯টি হামলার দাবি হুথিদের উত্তরখানে যুবলীগের গোপন বৈঠক, পুলিশি অভিযানে গ্রেপ্তার ৮ বিচ্ছেদ গুঞ্জন উড়িয়ে ছেলের জন্মদিনে একফ্রেমে রাজ-শুভশ্রী বিয়ের আনন্দ রূপ নিল বিষাদে, সড়কে ঝরল ৪ প্রাণ ইউক্রেনজুড়ে রাশিয়ার ভয়াবহ বিমান হামলা, ৯ জনের প্রাণহানি সুইডেনে সংসদ নির্বাচন: কট্টর ডানপন্থীদের সরকারে আসার জোর সম্ভাবনা

পুতের লাশটা দেশে চাই মা রোকেয়া খাতুন

রাশিয়ায় চাকরির প্রলোভনে গিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে প্রাণ গেল নান্দাইলের মামুনের


  • আপলোড সময় : শুক্রবার ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সময় : ৮:৫৬ পিএম

ঘরের একমাত্র সন্তানকে ঘিরে কতো শত রঙিন স্বপ্ন লালন করছিলেন মা রোকেয়া খাতুন। ভেবেছিলেন অভাব-অনটনের সংসারে একটু হলেও স্বস্তি ফিরবে, মাথার ওপর থেকে ঋণের পর্বতসম বোঝা কমবে এবং জরাজীর্ণ ভাঙা ঘরের জায়গায় উঠবে একটি পাকা ঘর। ছেলে আল মামুন বিদেশে গিয়ে ভালো আয় করবেন, দুই-তিন বছর পর সুখে-শান্তিতে দেশে ফিরবেন—এমনই অমলিন আশায় সাড়ে ৮ লাখ টাকা জোগাড় করে ছেলেকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছিলেন মা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই স্বপ্ন আজ চুরমার হয়ে গেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের রণাঙ্গনে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন মামুন। সন্তান হারানোর নির্মম খবর পাওয়ার পর থেকেই পরিবারটিতে চলছে শোকের মাতম। বাকরুদ্ধ মা ও স্ত্রীর এখন একটাই আকুল আকুতি—যেভাবেই হোক মামুনের মরদেহটি যেন শেষবারের মতো দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়।


নিহত আল মামুন (২৪) ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার খারুয়া ইউনিয়নের খারুয়া গ্রামের মৃত আবুল কাশেম ও রোকেয়া খাতুন দম্পতির একমাত্র সন্তান। দেশে থাকতে তিনি ইলেকট্রিশিয়ান ও প্লাম্বিংয়ের কাজ করতেন। পরিবারে স্ত্রী মহিমা আক্তার, চার বছর ছয় মাস বয়সী ছেলে আরিয়ান মাহমুদ মাহিন এবং মাত্র পাঁচ মাস বয়সী কন্যাসন্তান আরিশফাকে রেখে গত ৭ মে উন্নত ভবিষ্যতের আশায় রাশিয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন মামুন। পরিবারকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল, রাশিয়ায় গিয়ে তিনি ইলেকট্রিক মিস্ত্রির কাজ করবেন এবং তিন বছরের মধ্যে ঋণের টাকা পরিশোধ করে নতুন পাকা ঘর তুলবেন। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই দালালদের চরম প্রতারণায় পাল্টে যায় মামুনের জীবনগল্প।


ঘটনার রোমহর্ষক বিবরণ দিয়ে মামুনের সঙ্গে একই ফ্লাইটে রাশিয়া যাওয়া ঝিনাইদহের বাসিন্দা রাজন হোসেন জানান, তাদের ৩০ জন বাংলাদেশির একটি দলকে ইলেকট্রিশিয়ানের চটকদার চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়া নেওয়া হয়। ৮ মে তারা পৌঁছানোর পর ১২ মে ব্যাংক কার্ড, সিম ও আকামা দেওয়ার কথা বলে তাদের একটি রুশ ভাষার চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়। ভাষা বুঝতে না পারায় তারা জানতে পারেননি যে, সেটি আসলে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগদানের চুক্তি ছিল। পরবর্তীতে তাদের একটি সেনাক্যাম্পে নিয়ে ১০ থেকে ২১ দিনের সংক্ষিপ্ত সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং গত ১২ জুন সরাসরি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বিপজ্জনক সম্মুখসারিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। রাজন জানান, ১৪ জুনের ড্রোন হামলা ও মাইন বিস্ফোরণে দলের অন্তত ১৭ জন বাংলাদেশি নিহত হন। রাজন নিজে আহত হয়ে চিকিৎসা শেষে গত ২৩ আগস্ট বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফেরেন এবং তাদের দায়িত্বে থাকা রুশ সামরিক কমান্ডারের মাধ্যমে মামুনের মৃত্যুর খবর পান।


এদিকে গত মে মাসে মামুন যখন দেশ ছাড়েন, তখন তার ছোট মেয়ে আরিশফার বয়স ছিল মাত্র দেড় মাস। আড়াই মাসের মাথায় বাবার মৃত্যুর খবরে পরিবারে নেমে এসেছে চরম অন্ধকার। ছেলেকে পাঠাতে ব্র্যাক থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ, ধানের ওপর চার লাখ টাকা দাদন এবং স্বজনদের থেকে ধার ছাড়াও শেষ সম্বল নিজের গৃহপালিত গরু পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছিল।


মামুনের খালা-শাশুড়ি মোসাম্মৎ কোবিলা আক্তার অভিযোগ করেন, ‘জাবাল-এ নূর’ নামের একটি এজেন্সির মাধ্যমে প্রতারণার শিকার হয়ে ৩০ জন বাংলাদেশি বলির পাঁঠা হয়েছেন। তারা বিষয়টি নিয়ে প্রবাস কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করলেও কোনো কার্যকর সমাধান পাননি। নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত জানান, মামুনের মৃত্যুর বিষয়টি পরিবার মৌখিকভাবে জানিয়েছে। লিখিত আবেদন পেলে জেলা প্রশাসনের প্রবাসী কল্যাণ শাখার মাধ্যমে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে মরদেহ দেশে আনার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর