‘মা এবার ঢাকা থেকে ফিরে তোমার জন্য নতুন ঘর করে দেব।’ রাজধানীতে নির্মাণশ্রমিকের কাজে যোগ দিতে যাওয়ার আগে মাকে এই আশ্বাসের কথাই দিয়েছিলেন ২৪ বছর বয়সী মেহেদী হাসান মিম। পরিবারের চরম অভাব ঘোচানো এবং মায়ের জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরটি বদলে দিয়ে নতুন ঘর তোলার অদম্য স্বপ্ন ছিল তাঁর বুকে। কিন্তু এক ধনীর দুলালের বেপরোয়া গাড়ির নিচে পিষ্ট হয়ে চিরতরে নিভে গেল সেই স্বপ্ন। বারিধারার ফুটপাতে প্রাইভেট কারের চাকায় প্রাণ হারিয়ে মেহেদী এখন কেবলই একটি নিথর মরদেহ।
বুধবার বিকেলে নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নের হাজিপাড়া গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শোকের মাতম। নিহত মেহেদী হাসান ওই গ্রামের এরশাদুল হকের ছেলে। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। জন্মগতভাবে বাকপ্রতিবন্ধী হলেও অন্যের কথা স্পষ্ট বুঝতে পারতেন মেহেদী। ডোমার সরকারি কলেজের সাবেক এই শিক্ষার্থী বৃদ্ধ বাবার সংসারের অভাব দূর করতে এলাকার অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে গত সোমবার রাতে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন। মঙ্গলবার সকালে বারিধারায় পৌঁছে আসরের নামাজ শেষে ফুটপাতে বিশ্রাম নেওয়ার সময় বেপরোয়া গতির একটি প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাকে চাপা দেয়। পরে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরিবারের একমাত্র অবলম্বনকে হারিয়ে পাগলপ্রায় মা মিনু বেগম আহাজারি করে বলেন, ‘গরিব মানুষ বলে কি আমাদের স্বপ্ন দেখার কোনো অধিকার নেই? ছেলেটা বলেছিল ঢাকায় কাজ করে আমার জন্য ঘর তুলবে, কিন্তু লাশ হয়ে ফিরল সে। আমি এই হত্যার বিচার চাই।’ নিহতের মামাতো ভাই সাজ্জাদ চৌধুরী জয় জানান, পরিবারে কোনো আবাদি জমি না থাকায় দিনমজুরির ওপর নির্ভর করেই বেঁচে থাকতে হয় তাদের। আইনি প্রক্রিয়া শেষে বুধবার সকালেই গ্রামের বাড়িতে মেহেদীর দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
এদিকে মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ঘাতক প্রাইভেট কারটি চালাচ্ছিল এক অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনায় জানা গেছে, গাড়িটির চালক এক কিশোর এবং তার বাবা বাংলাদেশ বিমানের একজন ক্যাপ্টেন। গুলশানের মতো অভিজাত এলাকার এই ধনীর দুলালের বেপরোয়া ড্রাইভিং ও হেঁয়ালিপনায় একটি দরিদ্র পরিবারের সমস্ত আলো চিরতরে নিভে গেল। ডোমার থানার তদন্ত ওসি আছগর আলী জানান, আইনি প্রক্রিয়া শেষে নিহতের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।