রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসজুড়ে জমে থাকা পানি, অপরিচ্ছন্ন ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং অব্যবহৃত স্থানে ময়লা-আবর্জনার স্তূপের কারণে এডিস মশার প্রজনন ও ডেঙ্গুর ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্ষা ও এর পরবর্তী এই সময়ে স্কুল-কলেজের ছাদ, খেলার মাঠ, নর্দমা ও পরিত্যক্ত কোণগুলোতে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি আটকে থাকায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। সরকারের তরফ থেকে নানা নির্দেশনা ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হলেও মাঠপর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি ও তদারকির অভাবে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মশার নিরাপদ প্রজননক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।
সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এর আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠানের মূল ফটক বা প্রবেশপথ ঝলমলে ও পরিষ্কার থাকলেও ভেতরের চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। বিশেষ করে প্রধান ভবনের পেছনের অংশ, সিঁড়ির নিচের অন্ধকার জায়গা, ক্যান্টিনের পেছনভাগ, কর্মচারীদের ব্যবহারের স্থান কিংবা দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকা স্টোররুমে চরম পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি রয়েছে। কোথাও বৃষ্টির পানি জমে থাকতে দেখা গেছে, আবার কোথাও পলিথিন ও আবর্জনায় ড্রেনের মুখ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে আছে। এছাড়া প্লাস্টিকের বোতল, পুরোনো বালতি, ভাঙা ফুলের টব কিংবা নির্মাণসামগ্রীর ফাঁকে জমে থাকা পানি এডিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।
বিশেষ করে পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এই সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়া স্যাঁতস্যাঁতে ভবন, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং প্রাচীন ড্রেনেজ অবকাঠামোর কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক নর্দমায় ঢাকনা না থাকায় ময়লা জমে পানি প্রবাহের গতি রুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, ছাত্রাবাস, স্টোররুম, মাঠের প্রান্ত এবং নির্মাণাধীন এলাকাগুলো দীর্ঘদিন তদারকির বাইরে থাকায় সেখানে সহজেই মশার লার্ভা জন্ম নিতে পারে। ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজের ক্যাম্পাস ও এর আশপাশের আবাসিক এলাকার চিত্রও অনেকটা একই রকম। সামনের অংশ কিছুটা পরিচ্ছন্ন রাখা হলেও ভেতরের আবাসিক এলাকা এবং কম ব্যবহৃত স্থানগুলোতে নোংরা পানির দীর্ঘস্থায়ী প্রবাহ ও ময়লার স্তূপ দেখা যায়।
ঢাকা কলেজের উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির শিক্ষার্থী নাবিল আহমেদ জানান, সকালে ক্লাসে বসে অনেক সময় মনোযোগ দিয়ে পড়ার পরিবর্তে মশার কামড় খেতে হয়। বাইরে থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিষ্কার মনে হলেও ভেতরের শ্রেণিকক্ষ ও করিডোরের কিছু অংশে মশার উপদ্রব অত্যন্ত বেশি। ডেঙ্গুর এই ভরা মৌসুমে শিক্ষার্থীদের মনে স্বাভাবিকভাবেই বড় ধরনের ভীতি কাজ করে।
একই কলেজের স্নাতক শ্রেণির আবাসিক শিক্ষার্থী মইনুল ইসলাম বলেন, আবাসিক এলাকার কিছু কোণায় ময়লা-আবর্জনা ও পানি জমে থাকে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর মশার উৎপাত বহুগুণ বেড়ে যায়। যদি নিয়মিত এসব স্থান পরিষ্কার করা হতো এবং ড্রেনের পানি নিষ্কাশন স্বাভাবিক রাখা হতো, তবে এই ভোগান্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব ছিল।
শুধু কলেজ নয়, রাজধানীর গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের পরিবেশ নিয়েও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকরা। সকালে মর্নিং শিফটে সন্তানকে বিদ্যালয়ে নিয়ে এসে বাইরে অপেক্ষারত অভিভাবক নাসিমা সুলতানা জানান, ক্লাস শুরুর আগে থেকেই সন্তানদের মশার কামড় নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। অনেক সময় বাধ্য হয়ে বাচ্চাদের শরীরে ওডোমস ক্রিম মেখে দিতে হয়। এত ছোট বয়স থেকেই প্রতিদিন এভাবে মশা তাড়ানোর প্রস্তুতি নিয়ে স্কুলে পাঠানো অত্যন্ত অস্বস্তিকর।
আরেক অভিভাবক রাজিয়া আক্তার বলেন, সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে সারাক্ষণ এই ভয়ে থাকতে হয় যে সে ক্লাসে বসে মশার কামড় খাচ্ছে কি না। বিশেষ করে সকালের দিকে শ্রেণিকক্ষগুলোতে মশার উপস্থিতি থাকলে কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। ফগিংয়ের ওপর অন্ধভাবে নির্ভর না করে মশার মূল উৎস ও প্রজননস্থলগুলো শনাক্ত করে তা ধ্বংস করা জরুরি।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ঢাকা জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনায় মহানগরী ও জেলার প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ক্লিন স্কুল টিম’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই কমিটির সভাপতি হিসেবে থাকবেন প্রতিষ্ঠানপ্রধান। এছাড়া একজন অভিভাবক প্রতিনিধি, স্থানীয় কাউন্সিলর বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কর্তৃক মনোনীত প্রতিনিধি, দুজন শিক্ষার্থী এবং প্রতিষ্ঠানপ্রধান মনোনীত একজন শিক্ষক সদস্যসচিব হিসেবে এই টিমে দায়িত্ব পালন করবেন।
অন্যদিকে, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতি শনিবার বাধ্যতামূলকভাবে ডেঙ্গু মশা নিধন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা অভিযানে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোনো অবস্থাতেই শিক্ষার্থীদের দিয়ে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ, বিষাক্ত কিংবা অস্বাস্থ্যকর বর্জ্য পরিষ্কার করানো যাবে না বলে কড়া নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম মনে করেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরাই দিনের দীর্ঘ সময় কাটায়। তারা যদি নিজেদের ক্যাম্পাস ও চারপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে সচেতন হয়ে ওঠে, তবে এডিস মশার প্রজননস্থল গড়ে ওঠার সুযোগ আপনাআপনি বহুলাংশেই কমে যাবে।