দীর্ঘ প্রায় চার বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বাংলাদেশিদের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত হলো মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। তবে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা ঢাকঢোল পেটানো ছাড়াই অত্যন্ত নীরবে এই শ্রমবাজারের কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
গত সোমবার মালয়েশিয়ার শীর্ষস্থানীয় সুপারমার্কেট চেইন এনএসকে ট্রেড সিটির একটি বিশেষ চাহিদাপত্রের পরিপ্রেক্ষিতে ২৮ জন বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়। দেশটির বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে এই চাহিদাপত্র সত্যায়নের মাধ্যমেই মূলত দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার পর মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর পথ পুনরায় চালু হলো। হাইকমিশনের দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, বাংলাদেশি অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সি গুডনেস সার্ভিসেস লিমিটেডের মাধ্যমে এই চাহিদাপত্রের সত্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। দুই দেশের সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসায় আকস্মিক এই বাজার চালুর বিষয়টি নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এর আগে শ্রমবাজারটি পুনরায় চালুর লক্ষ্যে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক, দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনা ও নানা প্রচেষ্টা চালানো হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছিল না। ফলে কর্মী ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মধ্যে হতাশা ও শঙ্কা দিন দিন বেড়েই চলেছিল। এই স্থবিরতা কাটাতে সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া গমন করেন। সেখানে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে কর্মী প্রেরণের বিষয়টি জোরালোভাবে স্থান পায়। দুই নেতার এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার ফলেই মূলত মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের দরজা বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত হয়। তবে এখন পর্যন্ত দুই দেশের রাষ্ট্রীয় পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
এদিকে মালয়েশিয়া সরকার প্রায় এক মাস আগে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশ থেকে বিদেশি কর্মী নিয়োগের নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও ধাপগুলো প্রকাশ করলেও, বাংলাদেশ থেকে কোন প্রক্রিয়ায়, কোন এজেন্সির মাধ্যমে এবং ঠিক কত টাকা খরচে কর্মীরা দেশটিতে যেতে পারবেন—সে বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা বা সরকারি ঘোষণা আসেনি। এই ধোঁয়াশার সুযোগে কিছু অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি, দালাল এবং মধ্যস্বত্বভোগী চক্র ইতোমধ্যে অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানামুখী লোভনীয় প্রচারণা, চাকুরির মিথ্যা আশ্বাস এবং অল্প খরচে দ্রুত মালয়েশিয়া পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ চাকরিপ্রত্যাশীদের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। এর ফলে তরুণ চাকরিপ্রত্যাশীদের মধ্যে মারাত্মকভাবে প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে। অতীতেও নির্ধারিত খরচের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অর্থ ব্যয় করে কর্মীদের মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমাতে হয়েছিল। জনমনে প্রবল আশঙ্কা রয়েছে, এবারও হয়তো একই অশুভ চক্রের দৌরাত্ম্য অব্যাহত থাকতে পারে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, সাধারণ কর্মীদের স্বার্থরক্ষা এবং স্বল্প খরচে নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি বজায় রাখা হবে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই শ্রমবাজারের স্বচ্ছতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরই অনেকাংশেই নির্ভর করছে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের স্থায়িত্ব। অতীতের সব অনিময় ও দুর্নীতির পুনরাবৃত্তি কঠোরভাবে রোধ করা এবং সহজ সরল চাকরিপ্রত্যাশীদের যেকোনো মূল্যে দালালচক্রের খপ্পর থেকে রক্ষা করা বর্তমান সরকারের সামনে একটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।