বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সরকারি প্রাক্কলিত দরের ব্যাপক ফারাকের কারণে বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের মারাত্মক আশঙ্কায় পড়েছেন খুলনার ঠিকাদাররা। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) চলমান ও আসন্ন সকল টেন্ডার কার্যক্রম বয়কটের কঠোর ঘোষণা দিয়েছে ঠিকাদার কল্যাণ সমিতি। সোমবার (৫ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টায় খুলনা প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। জেলা প্রতিনিধি ফাহিম ইসলাম জানিয়েছেন, নির্মাণসামগ্রীর লাগামহীন দাম এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির পরও সরকারি প্রাক্কলিত মূল্য সমন্বয় না করায় এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ঠিকাদাররা অভিযোগ করেন যে, বর্তমানে সরকারি টেন্ডারে যে দর নির্ধারণ করা হচ্ছে, তার সঙ্গে খোলা বাজারের বাস্তব চিত্র ও জ্বালানি ব্যয়ের কোনো মিল নেই। বর্তমান অসঙ্গতিপূর্ণ মূল্যে কাজ গ্রহণ করলে তা শেষ করার পর প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে চরম আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, সরকারি নথিতে এক ব্যারেল বিটুমিনের মূল্য প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ টাকা ধরা হলেও ভ্যাট ও আয়কর কর্তনের পর ঠিকাদারের প্রকৃত প্রাপ্তি দাঁড়ায় মাত্র ১২ হাজার টাকা। অথচ বাজারে বর্তমানে ১৫০ কেজির এক ব্যারেল বিটুমিন কিনতে খরচ করতে হচ্ছে প্রায় ১৯ হাজার টাকা। একইভাবে পাথরের মূল্যও উর্ধ্বমুখী; গত বছর প্রতি টন পাথর ৪ হাজার ২০০ টাকায় পাওয়া গেলেও বর্তমানে পরিবহন খরচ বাদেই তা ৪ হাজার ৭০০ টাকায় ক্রয় করতে হচ্ছে।
নির্মাণে অপরিহার্য অন্যান্য উপাদানের মূল্যবৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরে ঠিকাদাররা জানান, বিগত বছরগুলোতে প্রতি হাজার ইটের দাম ৯ থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকায় ঠেকেছে। এ ছাড়া প্রতি টন কয়লার দাম গত বছরের ১৭ হাজার টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে প্রায় ২৫ হাজার টাকায় গিয়ে পৌঁছেছে। শুধু তাই নয়, প্রতি ঘনফুট বালুর দামও গত বছরের ৬০ টাকা থেকে বেড়ে এখন ৮০ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে, দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের লাগাতার দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে নির্মাণকাজের প্রতিটি স্তরে। এর ফলে শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি থেকে শুরু করে ভারী যন্ত্রপাতি পরিবহন এবং সামগ্রিক পরিচালনা ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে। অথচ এলজিইডির টেন্ডারে পুরোনো ও অবাস্তব প্রাক্কলিত মূল্য বহাল থাকায় ঠিকাদারদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
খুলনা এলজিইডির অফিসিয়াল পোর্টালে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে বেশ কিছু নতুন টেন্ডার নোটিশ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে গত ২২ সেপ্টেম্বর ৭, ৮ ও ৯ নম্বর এবং ২৯ সেপ্টেম্বর ১১ নম্বর টেন্ডার নোটিশ জারির তথ্য পাওয়া গেছে। এসব টেন্ডারে অংশ না নেওয়ার বিষয়ে অনড় থেকে ঠিকাদার নেতারা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উন্নয়নকাজ বন্ধ রাখতে চান না। তবে বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে টেন্ডারের প্রাক্কলিত মূল্য পুনরায় নির্ধারণ করা না হলে বড় অঙ্কের লোকসান এড়ানোর কোনো পথ খোলা থাকবে না। সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয় যে, এই সংকট নিরসনে দ্রুত কোনো ফলপ্রসূ উদ্যোগ নেওয়া না হলে খুলনার বিভিন্ন এলাকার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ স্থবির হয়ে পড়তে পারে। স্থানীয় ঠিকাদাররা সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সহযোগী হিসেবে কাজ করতে সবসময় প্রস্তুত রয়েছেন, তবে অবাস্তব মূল্যের টেন্ডারে অংশ নিয়ে নিজেদের পুঁজি হারাতে চান না তাঁরা। অবিলম্বে টেন্ডারের মূল্য পুনর্নির্ধারণ, নির্মাণসামগ্রীর বাজারদর স্থিতিশীল রাখা এবং ঠিকাদারদের লোকসানের ঝুঁকি কমাতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ ও কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।