খুলনা অঞ্চলে শিশুদের মাঝে হামের প্রাদুর্ভাব ও টিকাদানে অনিয়ম নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা বিঘ্নিত হওয়ায় শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি উদ্বেগজনকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে এইচপিভি ভ্যাকসিন কার্যক্রম আরও বেগবান করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
গত রোববার দুপুরে নগরীর শেরে বাংলা রোডের নগর স্বাস্থ্য ভবনে খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) উদ্যোগে এবং ইউনিসেফের সহযোগিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাডভোকেসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু টিকাদানে ধারাবাহিকতার ঘাটতির কথা তুলে ধরে জানান যে, খুলনায় হামে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ২৫ জন শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। এই পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের আওতায় নিয়ে আসার ওপর গুরুত্ব দেন।
অবশ্য প্রশাসকের বক্তব্যে উল্লিখিত ২৫ শিশুর মৃত্যুর এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রচলিত জাতীয় হাম নজরদারি ব্যবস্থার তথ্যের কিছু ভিন্নতা রয়েছে। স্বাস্থ্য দপ্তরের নিয়মানুযায়ী নিশ্চিত হাম এবং হামসদৃশ উপসর্গের মৃত্যুর তথ্যগুলো আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা হয়। ফলে স্থানীয়ভাবে আলোচিত এই মৃত্যুর সংখ্যার সঙ্গে সরকারি হিসাবের মধ্যে কিছুটা তারতম্য থাকতে পারে। তবুও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সময়মতো টিকা দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। বক্তারা উল্লেখ করেন, সঠিক সময়ে টিকা প্রদান করা হলে হামসহ অন্যান্য প্রতিরোধযোগ্য রোগের সংক্রমণ থেকে শিশুদের রক্ষা করা সম্ভব। তাই টিকা গ্রহণে কোনো অবহেলা না করে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী শিশুদের টিকাদান নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
সভায় জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে এইচপিভি ভ্যাকসিনের অপরিহার্যতার দিকটিও আলোচিত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে এইচপিভি ভ্যাকসিনকে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি আলোচনাধীন রয়েছে। কেসিসির এই সভায় নিয়মিত টিকাদান ব্যবস্থার সঙ্গে এই টিকা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। বক্তারা জানান, জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধযোগ্য রোগ হলেও সচেতনতার অভাব ও সময়মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় অনেক নারী এ রোগে আক্রান্ত হন। তাই কিশোরী ও অভিভাবকদের মধ্যে এইচপিভি টিকা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কেসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিব আহমেদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক মো. আশরাফ আলী, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) শেখ মো. নুরুল ইসলাম, ইমাম পরিষদ-খুলনার সাধারণ সম্পাদক মো. গোলাম কিবরিয়া এবং ইউনিসেফ খুলনার ইপিআই স্পেশালিস্ট তাপস কুমার বিশ্বাস। সভা পরিচালনা করেন কেসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শরীফ শাম্মিউল ইসলাম। এতে নগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ও ধর্মীয় নেতারা অংশ নেন।
উল্লেখ্য, এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলে খুলনা বিভাগে হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে বিপুলসংখ্যক শিশুর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। তখন বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের হিসাবে ১৫ মার্চ থেকে ৭৫২ শিশু হাসপাতালে ভর্তি এবং ৫১টি নিশ্চিত হাম শনাক্ত হওয়ার কথা জানানো হয়েছিল; ওই সময়ে নয় শিশুর মৃত্যুর তথ্যও দেওয়া হয়েছিল। স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাম প্রতিরোধে টিকাদানের আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি যেসব শিশু নির্ধারিত টিকা পায়নি, তাদের শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনা এবং অভিভাবকদের সচেতন করা জরুরি।