এই শহর থেকে নিখোঁজ হলো আরও একটি নিষ্পাপ ফুল। খালি হলো আরও একটি মায়ের তিল তিল করে গড়ে তোলা কোল। শহরের অলিতে-গলিতে দিনরাত আকুল মাইকিং, কিংবা রাস্তার দেয়ালে দেয়ালে টাঙানো সানুনয় বিজ্ঞপ্তি—একজন বাবা ও মা অবিরাম খুঁজে ফিরছেন তাঁদের সেই প্রিয় মুখটি, যে মুখটি ছাড়া তাঁদের চেনা ঘরটি আর কিছুতেই ঘর হয়ে ওঠে না। সন্তানের বিচ্ছেদে মায়ের ডুকরে ওঠা তীব্র কান্না আর হাসিতে পরিণত হয় না।
সন্তানকে
হারানো এক নিঃস্ব বাবা-মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে
নিজেদের অবর্ণনীয় যন্ত্রণার কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, আমার আশা তো সারা জীবনই
থাকবে। আমি যত দিন বেঁচে
থাকব, তত দিনই বুদ্বুদে
আশা ধরে রাখব যে আমার মা
বেঁচে আছে, আমার মা একদিন অবশ্যই
ফিরে আসবে। আমার সন্তানকে বুকে ফিরে পেলে তবেই না আমার মন
ভালো লাগবে। সন্তান কাছে না থাকলে কি
কোনো বাবা-মায়ের মন ভালো লাগতে
পারে? একজন মায়ের কান্না আর আমার কান্নার
গভীর কষ্টটা কতটা তীব্র, তা তো আপনারা
বোঝেন। তাঁর মা বিগত ৬
দিন ধরে কিচ্ছু না খেয়ে শুধু
কেঁদে চলছেন।
অথচ
একটি শিশু হঠাৎ নিখোঁজ হলে মুহূর্তে তার ছবি ও পোস্ট সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ খোঁজে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পুলিশ খোঁজে,
অসহায় পরিবার দরজায় দরজায় ঘোরে, সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা ও মন্তব্যের ঝড়
ওঠে; এমনকি সমাজের নানা স্তরের মানুষ সেই অবুঝ নিখোঁজ শিশুর চরিত্র বিশ্লেষণেও নেমে পড়ে। কিন্তু শিশুটি হঠাৎ নিখোঁজ হওয়ার নেপথ্যের প্রকৃত কারণ কি কেউ গভীরভাবে
খোঁজে?
উদাহরণ
হিসেবে তুলে ধরা যায় ১১ বছরের শিশু
জিসান-এর করুণ কাহিনী।
মাদ্রাসা থেকে হঠাৎ নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর মায়ের
ফোনে আসে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ভিডিও কল। ফোনের পর্দায় দেখা যায় জিসানের হাত-পা নির্মমভাবে বাঁধা
অবস্থা। সেখানে অপহরণকারীরা অসহায় শিশুটিকে বেধড়ক পেটাতে থাকে এবং মুক্তির বিনিময়ে দাবি করে অর্ধলক্ষ টাকা। তবে অপরাধীদের সেই দাবিকৃত অর্থ মেটানো হলেও শেষ পর্যন্ত আদরের সন্তান জিসানকে পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়া হয়নি।
তাহলে
মোটা দাগে দেশে একের পর এক শিশু
নিখোঁজ হওয়ার নেপথ্য কারণ আসলে কী? অভিভাবকদের এক মুহূর্তের অনাকাঙ্ক্ষিত
অসতর্কতা, অসচেতনতা, পূর্বশত্রুতা নাকি কেবলই টাকার লোভ? আর শিশুদের এই
চরম নিরাপত্তাহীনতায় রাষ্ট্রেরই বা দায় ঠিক
কতটা? হারানো শিশু উদ্ধারে নিখাদভাবে কাজ করে যাওয়া দেশের একমাত্র বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ‘মুন অ্যালার্ট’-এর প্রতিষ্ঠাতার বক্তব্যে
উঠে এসেছে এর অনেক বাস্তবতা।
এ
বিষয়ে মুন অ্যালার্ট-এর সম্মানিত প্রতিষ্ঠাতা
সাদাত রহমান বলেন, আমরা যখন কোনো নিখোঁজ শিশুর বিষয়ে অ্যালার্ট জারি করি, তখন শেষ পর্যন্ত ওই শিশুটিকে আমরা
জীবিত নাকি মৃত অবস্থায় খুঁজে পাব, তা আমাদের জানা
থাকে না। এ ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে
উদ্ধার অভিযানে পুলিশের বিশেষ কোনো প্রশিক্ষিত দল ডেডিকেটেডভাবে কাজ
করছে না। হয়তো কোনো একটি স্থানীয় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করা হয়েছে, কিন্তু স্থানীয় থানা পুলিশের প্রযুক্তিগত বা কৌশলগত সক্ষমতা
অত্যন্ত সীমিত। ফলে নিখোঁজের পর অনেক সময়
শিশুটিকে জীবিত উদ্ধারের পরিবর্তে নির্মমভাবে মৃতদেহ হিসেবেই পাওয়া যায়।
যদিও
নিজেদের সার্বিক সক্ষমতার সর্বোচ্চটুকু দিয়ে হারিয়ে যাওয়া শিশু উদ্ধার ও পরিবারের কাছে
ফিরিয়ে দিতে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মুন অ্যালার্ট। সম্প্রতি অপ্রতিম নিখোঁজের আলোড়িত ঘটনার পর সাধারণ মানুষ
প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা সম্পর্কে নতুন করে জেনেছে এবং এদের কর্মপরিধিও পূর্বের তুলনায় অনেক বেড়েছে। আর এই উদ্ধার
তৎপরতা আরও কার্যকর ও গতিশীল করতে
চলতি বছরেই সংস্থাটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হতে যাচ্ছে নিজস্ব ‘কে-নাইন’ (K9) বিশেষ
কুকুর ইউনিট।
সাদাত
রহমান আরও যুক্ত করে বলেন, আমাদের কাছে যদি প্রশিক্ষিত কে-নাইন (K9) কুকুর
থাকত, তাহলে দেখা যেত নিখোঁজ হওয়ার মাত্র এক ঘণ্টা বা
এমনকি ৩০ মিনিটের মধ্যে
শিশুটি ঠিক কোথায় আটক রয়েছে, তা নিখুঁতভাবে খুঁজে
বের করা সম্ভব হতো। উন্নত বিশ্ব ও বিদেশের পুলিশও
কোনো শিশু হারিয়ে বা অপহৃত হলে
প্রথমেই কে-নাইন কুকুরের
সুনির্দিষ্ট ঘ্রাণশক্তির সাহায্যে তাকে দ্রুত খোঁজার মূল কাজ শুরু করে।
সম্প্রতি
একের পর এক শিশু
নিখোঁজের মর্মান্তিক ঘটনায় গভীর আতঙ্ক ও উদ্বেগে দিন
কাটাচ্ছেন অভিভাবকেরা। কেননা বুকের ভেতর পরম আদরে আগলে রাখা সন্তান পাশে না থাকলে যে
অবর্ণনীয় কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়, তাতে বারবার ভেঙে যায় মা-বাবার বুক।
শিশুদের সর্বাত্মক নিরাপত্ত নিশ্চিত করতে তাই রাষ্ট্রের আইন ও বিচার ব্যবস্থার
সমীপে সন্তানহারা মা-বাবার বুকচাপা
আর্তি যেন একটাই প্রশ্ন বারবার ছুড়ে দিচ্ছে—শিশুদের নিখোঁজের এমন করুণ সংবাদে রাষ্ট্রের ঘুম ভাঙবে কবে?