কুমিল্লা প্রতিনিধি:
কুমিল্লার
লালমাইয়ে বহুল আলোচিত সপ্তম শ্রেণির স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন (১৫)-কে শর্টকাটে পৌঁছে
দেওয়ার কথা বলে কৌশলে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ এবং পরবর্তীতে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে নৃশংসভাবে হত্যার লোমহর্ষক সব তথ্য প্রকাশ
করেছে পুলিশ। ঘাতক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া (৩৫)-কে গ্রেপ্তারের পর
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
আজ
শনিবার (১০ অক্টোবর ২০২৬)
দুপুরে কুমিল্লার পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে পাঠানো এক বিশেষ সংবাদ
বিজ্ঞপ্তিতে এই বিবরণ তুলে
ধরা হয়। এর আগে গত
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) চট্টগ্রাম
থেকে প্রধান অভিযুক্ত সুমনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী
বাহিনী।
সংবাদ
সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়া জানান, গত ৮ অক্টোবর
রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে তাজমিন পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার তিশা বাস কাউন্টারের সামনে থেকে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার নিজ বাসায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে। ঘাতক চালক সুমন মিয়ার সঙ্গে তার তিন শ’ টাকা ভাড়া
ঠিক হয়েছিল।
অটোরিকশায়
ওঠার পর কিছুদূর গিয়ে
তাজমিন চালককে এক শ’ টাকা
দিয়ে একটি দোকান থেকে কলা ও রুটি কিনে
আনে। এরপর প্রতারক চালক সুমন তাকে ‘শর্টকাট’ বা দ্রুত গন্তব্যে
পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে হোটেল নূরজাহানের সামনে থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে (ইউটার্ন নিয়ে) চাঁদপুরগামী সড়ক ধরে বিজরা বাজারের দিকে এবং পরবর্তীতে একটি সম্পূর্ণ নির্জন এলাকার দিকে নিয়ে যায়।
পুলিশের
ভাষ্য অনুযায়ী, গাড়িটি একটি নির্জন ও অন্ধকার স্থানে
পৌঁছানোর পর সুমন অটোরিকশা
থামিয়ে দেয়। চারপাশ ফাঁকা দেখে জায়গাটি রেসকোর্স এলাকা নয় বুঝতে পেরে
তাজমিন মারাত্মকভাবে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় লম্পট
সুমন তাকে জোরপূর্বক আটকে অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার চেষ্টা চালালে তাজমিন চিৎকার শুরু করে।
পুলিশের
কাছে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে ঘাতক সুমন জানিয়েছে, ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে সে তাজমিনকে ধর্ষণ
করে। এরপর ঘটনা ধামাচাপা দিতে সে নিজের গলায়
থাকা গামছা দিয়ে তাজমিনের গলা পেঁচিয়ে ধরে। ধস্তাধস্তির ফলে স্কুলছাত্রী দুর্বল হয়ে পড়লে তাকে পাশের একটি ধানক্ষেতে নিয়ে গিয়ে উপুড় করে শুইয়ে মাথা পা দিয়ে চেপে
ধরে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে।
তাজমিনের
মৃত্যু নিশ্চিত করার পর ঘাতক সুমন
তার হ্যান্ডব্যাগ থেকে একটি আইফোন ছিনিয়ে নেয়। পরে ভ্যানিটি ব্যাগটি ধানক্ষেতেই ফেলে রেখে ঘটনাস্থলেই নিজের অটোরিকশাটি রেখেই সে পালিয়ে যায়।
সে হেঁটে বাখরাবাদ এলাকার কাচিকাটা মসজিদের সামনে গিয়ে একটি পুকুরে নেমে নিজের শরীরে থাকা রক্তের দাগ ও অপরাধের চিহ্ন
ধোয়ার জন্য গোসল করে। এরপর অন্য একটি ভাড়ায় চালিত সিএনজিতে চড়ে সে বাখরাবাদ এলাকায়
পৌঁছায়। সেখানে একটি পুকুরপাড়ের ঘন জঙ্গলে তাজমিনের
লুট করা আইফোনটি লুকিয়ে রেখে সে চট্টগ্রাম পালিয়ে
গিয়েছিল।
পরবর্তীতে
তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের
ভিত্তিতে গত ৯ অক্টোবর
চট্টগ্রাম থেকে অভিযুক্ত সুমনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তার দেওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্য ও চিনিয়ে দেওয়া
মতে বাখরাবাদ এলাকার ওই পুকুরপাড়ের জঙ্গল
থেকে নিহত স্কুলছাত্রীর ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করা হয়।
উল্লেখ্য,
গত ৮ অক্টোবর সকালে
লালমাই উপজেলার ভোরাজগৎপুর উত্তরপাড়া গ্রামের একটি ধানক্ষেতের আইলের পাশে তাজমিনের নিথর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন।
খবর পেয়ে লালমাই থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার ও প্রাথমিক তদন্ত
শুরু করে। পরবর্তীতে নিহতের বাবা এসে মরদেহটি তাঁর মেয়ে তাজমিনের বলে শনাক্ত করেন।
নিহত
জান্নাতুল তাজমিন কুমিল্লা নগরীর ঐতিহ্যবাহী ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তাঁর স্থায়ী বাড়ি যশোর জেলায় হলেও বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে সে কুমিল্লা নগরীর
রেসকোর্স এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করত। এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের
ঘটনায় নিহতের পরিবার বাদী হয়ে লালমাই থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর জেলা গোয়েন্দা
পুলিশ (ডিবি) ও থানা পুলিশ
যৌথভাবে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে
এই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের রহস্য সফলভাবে উন্মোচন করে।