বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ১১৪ বছরের পুরোনো একটি ঐতিহাসিক চিঠি প্রকাশ করেছে নোবেল পুরস্কারের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ। ব্রিটিশ দার্শনিক ও যুক্তিবিদ বার্ট্রান্ড রাসেলকে লেখা এই চিঠিতে ধর্ম, উপনিষদ এবং মানুষের অসীম সত্তা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের গভীর দার্শনিক ভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়। দুই নোবেলজয়ীর চিন্তার আদান-প্রদানের স্মারক এই চিঠি নতুন করে আলোচনায় এসেছে সাহিত্যপ্রেমী ও গবেষকদের মধ্যে।
নোবেল পুরস্কারের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে চিঠিটির ছবি প্রকাশ করে বলা হয়েছে, সাহিত্যে নোবেলজয়ী বার্ট্রান্ড রাসেল ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যকার ১১৪ বছর আগের এই চিঠিপত্রের দিকে পাঠকদের নজর দিতে। চিঠিটি প্রকাশের পর দুই মনীষীর পারস্পরিক চিন্তাভাবনা ও দর্শনচর্চা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
চিঠিটি কানাডার ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত বার্ট্রান্ড রাসেল আর্কাইভস থেকে সংগৃহীত। ১৯১২ সালের ১৩ অক্টোবর লেখা এই চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ জানান, তিনি সম্প্রতি রাসেলের ‘দ্য এসেন্স অব রিলিজিয়ন’ বা ‘ধর্মের সারকথা’ শীর্ষক প্রবন্ধটি পড়েছেন। প্রবন্ধটি পড়ে তাঁর মনে পড়ে যায় প্রাচীন ভারতীয় ধর্মীয় ও দার্শনিক গ্রন্থ উপনিষদের একটি শ্লোকের কথা।
রবীন্দ্রনাথ চিঠিতে উপনিষদের ওই শ্লোকের মূল সংস্কৃত পাঠ রোমান হরফে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি এর ইংরেজি অনুবাদ ও নিজস্ব দার্শনিক ব্যাখ্যাও তুলে ধরেন। তাঁর ব্যাখ্যায় মানুষের সীমাবদ্ধ সত্তা অতিক্রম করে অসীমের সঙ্গে আনন্দময় সংযোগ স্থাপনের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের ভাবনা অনুযায়ী, মানুষ যখন নিজের সংকীর্ণ ও সসীম সত্তার সীমা অতিক্রম করে অসীম জীবনের আনন্দ উপলব্ধি করতে পারে, তখনই সে জাগতিক নানা ভয় থেকে মুক্ত হওয়ার পথ খুঁজে পায়। চিঠির এই বক্তব্যে আধ্যাত্মিক উপলব্ধি, মানবজীবন ও ভয়মুক্তির সম্পর্ক নিয়ে তাঁর দর্শনের প্রতিফলন দেখা যায়।
উপনিষদ প্রাচীন সংস্কৃত ভাষায় রচিত আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক গ্রন্থসমূহের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকলন। হিন্দু দর্শনের বিভিন্ন ধারায় এসব গ্রন্থের বিশেষ প্রভাব রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর চিঠিতে উপনিষদের ভাবনার সঙ্গে রাসেলের ধর্মবিষয়ক আলোচনার যোগসূত্র তুলে ধরেছিলেন। এর মধ্য দিয়ে দুই ভিন্ন চিন্তাধারার মনীষীর মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপের একটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯১২ সালের শুরুর দিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইংল্যান্ড সফরে গেলে বার্ট্রান্ড রাসেলের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ হয়। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরে তাঁদের মধ্যে চিন্তা ও দর্শন নিয়ে মতবিনিময় শুরু হয়েছিল। রাসেল ছিলেন দর্শন, যুক্তিবিদ্যা ও ধর্মবিষয়ক আলোচনার জন্য পরিচিত একজন ব্রিটিশ মনীষী। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও দর্শনচিন্তা তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিসরে বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়।
চিঠি লেখার পরের বছর, ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তিনি ছিলেন প্রথম অ-ইউরোপীয় নোবেলজয়ী সাহিত্যিক। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘গীতাঞ্জলি’র ইংরেজি অনুবাদ তাঁকে বিশ্বসাহিত্যে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়।
এর ৩৭ বছর পর, ১৯৫০ সালে বার্ট্রান্ড রাসেলও সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। মানবতাবাদ, চিন্তার স্বাধীনতা এবং বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর লেখালেখি তাঁকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করে তোলে।
দুই মনীষীর মধ্যে বিনিময় হওয়া এই চিঠি শুধু ব্যক্তিগত যোগাযোগের নিদর্শন নয়; এটি তাঁদের চিন্তা, দর্শন ও জ্ঞানচর্চার ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। নোবেল পুরস্কারের অফিশিয়াল পেজে চিঠিটি প্রকাশের ফলে এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগের সেই বুদ্ধিবৃত্তিক যোগাযোগ নতুন করে সামনে এসেছে।