নিজস্ব
সাংস্কৃতিক পরিচয়, সামাজিক মূল্যবোধ ও মানবমর্যাদা সমুন্নত
রাখার লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত
নিয়েছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসো। দেশব্যাপী প্রথাগত রূপচর্চা ও সব ধরনের
সুন্দরী প্রতিযোগিতা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করে এবার নারীদের মেধা, বুদ্ধি ও বৈজ্ঞানিক প্রতিভাকে
মূল্যায়নের অনন্য উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির সরকার। এর অংশ হিসেবে
বিজ্ঞানে মেধাবী তরুণী ও নারীদের আন্তর্জাতিক
অঙ্গনে তুলে ধরতে এবং তাদের উৎসাহিত করতে চালু করা হয়েছে ‘হাকিলি মুসো’ নামক একটি জাতীয় বিজ্ঞান প্রতিযোগিতা।
সংবাদমাধ্যম
ব্রিফলি ও আফ্রিকা ডট
ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৬ সালের জুন মাসে বুরকিনা ফাসো কর্তৃপক্ষ একটি সরকারি আদেশের মাধ্যমে দেশটিতে চালু থাকা প্রচলিত সব ধরনের সুন্দরী
প্রতিযোগিতা স্থগিত করে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও মানবমর্যাদা রক্ষার
তাগিদে একটি নতুন নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে এবং সেই নীতিমালার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত
এ ধরনের সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা বন্ধ থাকবে। এরই ধারাবাহিকতায় সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার ইতিবাচক বিকল্প হিসেবে নারীদের মেধা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে
সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে আগস্ট মাসে ‘হাকিলি মুসো’ নামক এই নতুন বিজ্ঞান
প্রতিযোগিতা চালুর ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয় দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
উদ্বোধনী
আসরেই ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এই প্রতিযোগিতা। এতে
দেশটির ৮৪ জন মেধাবী
তরুণী অংশ নেন, যারা প্রত্যেকেই ২০২৬ সালে বিজ্ঞানে ব্যাকালোরেট বা উচ্চমাধ্যমিক ও
সমমানের ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। বিজ্ঞানভিত্তিক ক্যারিয়ারে নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ও আত্মবিশ্বাস জোগাতে
মূল প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আগে তাদের নিয়ে এক সপ্তাহব্যাপী একটি
বিশেষ প্রস্তুতিমূলক বুট ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়। এই নিবিড় প্রশিক্ষণের
পর প্রতিযোগীরা সরাসরি গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের মতো
জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে
লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষায়
অংশগ্রহণ করেন। প্রতিটি বিষয়ে শীর্ষ পাঁচজন সেরা প্রতিযোগীকে বিজয়ী হিসেবে নির্বাচন করে তাদের আকর্ষণীয় পুরস্কার ও শিক্ষাবৃত্তি প্রদান
করা হয়। যার মধ্যে প্রথম স্থান অর্জনকারী প্রত্যেকে পুরস্কার হিসেবে পেয়েছেন ২০ লাখ সিএফএ
ফ্রাঙ্ক, একটি উন্নতমানের মোটরসাইকেল, একটি ল্যাপটপসহ মূল্যবান উপহার সামগ্রী।
প্রতিযোগিতা
সফলভাবে শেষ হওয়ার পর দেশের এই
উজ্জ্বল নারী বিজ্ঞানীদের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করেন বুরকিনা ফাসোর অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ও বিশিষ্ট সামরিক
কর্মকর্তা ইব্রাহিম ট্রাওরে। বিজয়ীদের উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়ে তিনি তাদের নিজেদের ভেতরের শক্তি ও বুদ্ধিমত্তার ওপর
অবিচল আস্থা রাখার আহ্বান জানান। বিজ্ঞানভিত্তিক পেশা ও ক্যারিয়ার বেছে
নেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি ইব্রাহিম ট্রাওরে তরুণীদের উদ্দেশে বলেন, তারা যেন জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রে সবসময় উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করে সাহসিকতার সঙ্গে সামনের দিকে এগিয়ে যান। রাষ্ট্রপতির এই সরাসরি সাক্ষাৎ
ও অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য অংশগ্রহণকারী তরুণীদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
উল্লেখ্য,
পশ্চিম আফ্রিকান সমাজে দীর্ঘদিন ধরে একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক পেশাগুলো কেবল
পুরুষদের জন্যই সংরক্ষিত। এই ধারণাকে অপ্রাসঙ্গিক
ও ভুল প্রমাণ করতেই মূলত ‘হাকিলি মুসো’ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। বুরকিনা ফাসো সরকারের দৃঢ় বিশ্বাস, এই উদ্যোগের মাধ্যমে
আগামীতে আরও বিপুলসংখ্যক নারী বৈজ্ঞানিক গবেষণা, প্রযুক্তি ও উচ্চশিক্ষার পরিসরে
স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসতে দারুণভাবে উৎসাহিত হবেন।