বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তোলার দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে ধর্মীয় পরিচয় নয়, বরং প্রতিটি মানুষের নাগরিক পরিচয়ই মূল শক্তি হিসেবে বিবেচিত হবে বলে দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অতীত ও সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বীরত্বগাথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেছেন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে দীর্ঘ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে এ দেশের সব ধর্মের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রাম করেছে। অর্জিত স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে রক্ষা করে আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণে সব বিভেদ ভুলে প্রতিটি নাগরিককে একযোগে কাজ করার উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি।
শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে রোববার রাতে রাজধানীর মহাখালী ও গুলশান-বনানী এলাকার পূজামণ্ডপ পরিদর্শকালে আয়োজিত পৃথক অনুষ্ঠানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। আয়োজনে সনাতন ধর্মাবলম্বী পূজারী ও দর্শনার্থীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা ও কুশল বিনিময় করেন তিনি। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন উপস্থিত ছিলেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও জাতীয় ঐক্যের বার্তা তুলে ধরে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, একাত্তর সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে বীর বাঙালি অস্ত্র তুলে নিয়ে জীবন বাজি রেখে লড়াই করে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। যুদ্ধের সেই কঠিন ময়দানে দাঁড়িয়ে আমরা কখনো দেখতে চাইনি কে কোন ধর্মের অনুসারী। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিষ্টান—যাঁরাই এই মাতৃভূমিকে হৃদয়ে ভালোবেসেছেন, তাঁরা সবাই একত্র হয়ে দেশ স্বাধীন করেছেন। ত্যাগের সেই চেতনাকে ধারণ করেই আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
স্বাধীনতার পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে এ দেশের মানুষের অর্জিত গণতন্ত্র মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। বারবার ছিনতাই হয়েছে ভোটাধিকার ও বাকস্বাধীনতা। তবে প্রতিবারই এ দেশের সাধারণ জনগণ তাদের কাঙ্ক্ষিত ভোটাধিকার এবং কথা বলার মৌলিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার তাগিদে রাজপথে নেমে এসে প্রতিবাদ জানিয়েছে। সেই সব গণআন্দোলনেও ধর্মীয় বা সামাজিক কোনো পরিচয় জাতীয় প্রতিরোধ আন্দোলনকে আটকে রাখতে পারেনি।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের গৌরবময় স্মৃতি স্মরণ করে তিনি আরও বলেন, সেদিনও কোনো দল বা মতের রাজনৈতিক পার্থক্য ছিল না। রাজপথে নেমে এসেছিল নারী-পুরুষসহ সর্বস্তরের ও সব পেশার মানুষ। সেখানেও কিন্তু কারো ধর্মীয় পরিচয় দেখা হয়নি। সবাই একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে ইতিহাস গড়ে গণঅভ্যুত্থানকে সফল ও সার্থক করেছিল।
আগামী দিনের বাংলাদেশ রূপকল্প তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, দেশকে স্বাধীন করা কিংবা দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার লড়াইয়ে যেমন ধর্ম কিংবা জাত বা গোত্র মুখ্য ছিল না; ঠিক একইভাবে আগামী দিনে নতুন করে দেশ গড়ার মহাসংগ্রামেও আমরা কোনো ধর্মীয় পরিচয় দেখতে চাই না। আমাদের মূল দৃষ্টি থাকবে কে এই দেশের বৈষম্যহীন নাগরিক। আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় এবং পবিত্র পরিচয় হলো আমরা সবাই বাংলাদেশের অধিবাসী।
অধিকার ও সম্প্রীতির বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, এই স্বাধীন ভূখণ্ডের ওপর যেমন দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার পূর্ণ অধিকার রয়েছে, ঠিক তেমনি আপনার এবং সাধারণ সব নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। এই গণতান্ত্রিক অধিকার শতভাগ প্রতিষ্ঠা করতে হলে সব ধর্ম, বর্ণ ও পেশার মানুষকে সাথে নিয়ে আমাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে। হাজার বছরের ইতিহাস প্রমাণ দেয়—এই ভূখণ্ডে অসাম্প্রদায়িক ভাবধারায় সব ধর্মের মানুষ শান্তিতে বসবাস করে আসছে এবং ভবিষ্যতেও সহাবস্থানে থাকবে।
পরিশেষে জানা যায়, রাতের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী মহাখালী রক্ষাকালী মন্দিরে যান এবং সেখানে পূজা উদ্যাপন কমিটির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। এরপর তিনি বনানীর পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে পূজার্থীদের শুভকামনা জানান।