প্রবাসীদের
ঘামঝরানো কষ্টার্জিত আয়ে সচল থাকে দেশের অর্থনীতির চাকা, অথচ আজ সেই রেমিট্যান্স
যোদ্ধারাই চরম অনিশ্চয়তা ও মানবেতর দুর্ভোগের
মুখে পড়েছেন। রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার জেরে সৃষ্ট ভয়াবহ নিরাপত্তা সংকটে সৌদি আরবগামী ফ্লাইট একের পর এক বাতিল
ও স্থগিত হওয়ায় রাজধানী ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এখন যেন প্রবাসীদের দীর্ঘশ্বাস আর কান্নার জনপদ।
সংক্ষিপ্ত ছুটি কাটিয়ে যথাসময়ে কর্মস্থলে ফিরতে না পেরে দিশেহারা
হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার বাংলাদেশি কর্মী। যাত্রা বারবার পিছিয়ে যাওয়ায় তাঁদের মাথার ওপর ঝুলছে ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়া ও চাকরি হারানোর
খড়্গ।
হজরত
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিভিন্ন টার্মিনালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রিয়াদগামী যাত্রীরা হাতে বিমানের টিকিট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
নিয়ে এয়ারলাইন্সের কাউন্টারগুলোতে হন্যে হয়ে ঘুরছেন। কেউ মুঠোফোনে দেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে চোখ মুছছেন, কেউ ট্রলির ওপর মালপত্র রেখে অসহায় ভঙ্গিতে বসে আছেন, আবার কেউ বিকল্প কোনো ফ্লাইটের সন্ধান করছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের জেলা থেকে বাস বা ব্যক্তিগত পরিবহনে
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে
ঢাকায় এসে ফ্লাইট বাতিলের খবর শুনে অনেকেই ভেঙে পড়েছেন।
টাঙ্গাইলের
মির্জাপুরের মালেক এক মাসের ছুটিতে
দেশে এসেছিলেন। ইয়েমেনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে তাঁর প্রথম টিকিট বাতিল হয়েছিল। এখন বাড়তি ৮০ হাজার টাকা
খরচ করে দুবাই হয়ে মদিনা যাওয়ার চেষ্টা করছেন। কুমিল্লার চান্দিনার মো. শরীফ সরকার তিন মাসের ছুটি কাটিয়ে আকামার মেয়াদ শেষের ভয়ে দ্রুত ফিরতে চেয়েও বিমানবন্দরে এসে জানতে পারেন সকালের ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। নাটোরের বড়াইগ্রামের আতিকুল ইসলাম প্রথমবার সৌদি আরব যাওয়ার পথে বিমানবন্দরে এসে ফ্লাইট বাতিলের কথা শুনে গুলশানে এয়ারলাইনসের অফিসে ছুটে যান। কুমিল্লার বামনপাড়ার মো. আসাদ কিংবা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার মো. মাইনুদ্দীনও পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। নোয়াখালীর রিয়াদ প্রবাসী আব্দুল মান্নান চার মাস ছুটি কাটিয়ে কর্মস্থলে ফেরার প্রস্তুতি নিয়ে বিমানবন্দরে এসে জানতে পারেন তাঁর ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে কাজে যোগ দিতে না পারলে তাঁর
চাকরি নিয়ে মারাত্মক সংকট তৈরি হবে।
বেসামরিক
বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বা বেবিচকের সর্বশেষ
তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচলে নিরাপত্তা বিধিনিষেধের কারণে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ও ট্রানজিট রুটে
চলাচলকারী মোট ১১৮টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করা
হয়েছে। এর ফলে এই
বিশালসংখ্যক ফ্লাইটের প্রায় ১৮ হাজার ৩৬২
জন যাত্রী চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বাতিল হওয়া এসব ফ্লাইটের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট রয়েছে ৫টি এবং ট্রানজিট ফ্লাইট রয়েছে ৬৬টি। এসব ফ্লাইট আকস্মিক বাতিল হওয়ায় কর্মস্থলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা প্রবাসীরা যেমন গভীর অনিশ্চয়তায় পড়েছেন, তেমনি বিকল্প রুটের টিকিটের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় তাঁরা নতুন করে বড় ধরনের আর্থিক
চাপের মুখে পড়েছেন।
বেবিচকের
সহকারী পরিচালক জনসংযোগ কাওছার মাহমুদ জানিয়েছেন, এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক
না হওয়া পর্যন্ত ফ্লাইট বাতিলের এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত
থাকতে পারে। তবে যাত্রীদের ক্রমবর্ধমান দুর্ভোগ কমাতে এবং ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এড়াতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বেসামরিক
বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম
রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, যাত্রীদের সুবিধার্থে সৌদি আরবের দাম্মাম ও মদিনাগামী বিকল্প
ফ্লাইটে পাঠানোর জোরালো চেষ্টা চলছে। আসন খালি থাকা সাপেক্ষে সম্পূর্ণ বিনা খরচে বা ন্যূনতম সমন্বয়ের
মাধ্যমে অন্যান্য ফ্লাইটে যাত্রীদের পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও জনশক্তি ব্যুরোর
তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার এবং
সেখান থেকে দেশের অর্থনীতিতে বিশাল পরিমাণ রেমিট্যান্স আসে। তাই প্রবাসীদের এই সংকটময় মুহূর্তে
দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।