শঙ্খের ধ্বনি, ঢাকের বোল আর উলুধ্বনিতে চারদিক মুখরিত করে আজ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের অন্যতম আকর্ষণ মহাঅষ্টমী ও কুমারী পূজা উদযাপিত হচ্ছে। ত্যাগের মহিমা ও ভক্তির আলোয় এ দিনটি ভক্তদের মনে নিয়ে আসে এক অনন্য আধ্যাত্মিক সুবাস, যেখানে নারীর মাতৃরূপের নিখাদ বন্দনায় মূর্ত হয়ে ওঠে পরম আরাধ্য দেবী দুর্গার চেতনা।
আজ মহাঅষ্টমী। শারদীয় দুর্গাপূজার এই পবিত্র ও মাহেন্দ্রক্ষণে ভক্তদের প্রধান আকর্ষণ থাকে অষ্টমীর বিশেষ আকর্ষণ কুমারী পূজা। শাস্ত্রে বর্ণিত বিধান অনুযায়ী, কুমারী বালিকার মধ্যে বিশুদ্ধ নারীর রূপ ও দিব্য চেতনা কল্পনা করে তাকে স্বয়ং দেবী জ্ঞানে গভীর ভক্তিভরে পূজা করেন ভক্তরা। ঐতিহ্যবাহী রামকৃষ্ণ মিশনে পরম আড়ম্বর ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে এ পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা দেখতে ভিড় জমান হাজারো পুণ্যার্থী।
হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে, সাধারণত এক থেকে ষোলো বছর বয়সের অজাতপুষ্প সুলক্ষণা ব্রাহ্মণ বা অন্য গোত্রের অবিবাহিত কুমারী নারীকে দেবী জ্ঞানে পূজা করার বিধান রয়েছে। শ্রীরামকৃষ্ণের কথামতে কুমারী পূজার গভীর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে যে, শুদ্ধাত্মা কুমারীর পবিত্র অন্তরে ভগবতির রূপ সবচেয়ে বেশি ও স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। মূলত নারীর মধ্যে মাতৃরূপ উপলব্ধি করাই এই পূজার মূল আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য। শাস্ত্রমতে বয়সের তারতম্যে কুমারীর বিভিন্ন নাম রয়েছে; যেমন—এক বছর বয়সে সন্ধ্যা, দুয়ে সরস্বতী, তিনে ত্রিধামূর্তি, চারে কলিকা, পাঁচে সুভাগা, ছয়ে উমা, সাতে মালনী, আটে কুজ্বিকা, নয়ে কালসন্দর্ভা, দশে অপরাজিতা, এগারোয় রুদ্রানী, বারোয় ভৈরবী, তেরোয় মহালক্ষ্মী, চোদ্দতে পীঠ নায়িকা, পনেরোতে ক্ষেত্রজ্ঞা এবং ষোলো বছর বয়সে তাকে অন্নদা নামে অভিহিত করা হয়।
নির্বাচিত কুমারীকে মহাঅষ্টমীর দিন ভোরে ঘুম থেকে তুলে পরম যত্নে গোসল করিয়ে নতুন বস্ত্র পরানো হয়। এরপর নানা অলঙ্কারে সুসজ্জিত করে কপালে সিঁদুর, পায়ে আলতা এবং হাতে ফুল দিয়ে পূজা মণ্ডপে নিয়ে আসা হয়। কুমারীকে একটি সুসজ্জিত আসনে বসিয়ে ষোড়শোপাচারে অর্থাৎ ষোলোটি উপাদানের মাধ্যমে স্বয়ং দেবী জ্ঞানে পূজা করা হয়। এ সময় চারপাশের পরিবেশ শঙ্খের ধ্বনি, ঢাকের বোল, উলুধ্বনি এবং ভক্তদের সম্মিলিত দেবী স্তুতিতে মুখরিত হয়ে ওঠে।
কুমারী পূজার প্রকৃত তাৎপর্য সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে পুরোহিত ও ধর্মানুরাগীরা বলেন, অনেক চিন্তাশীল মানুষ গভীরভাবে অনুভব করছেন যে, আধুনিক বিশ্বের বর্তমান সামাজিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সংকটগুলো সফলভাবে নিরসন করে মানবজাতিকে সামনে এগিয়ে নিতে হলে মাতৃজাতির প্রতি যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করা অত্যন্ত জরুরি। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নারীকে বিভিন্ন রূপ ও মর্যাদায় সম্মান জানানো হলেও নারীর সবচেয়ে মহিমময় ও পবিত্র রূপ হলো তার মাতৃত্বের রূপ। তাই এই পবিত্র মহাষ্টমী তিথিতে জগতের সব মাতৃজাতিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে কুমারী মাতাকে প্রণাম করা হয় এবং তার মাধ্যমে আদ্যাশক্তি মহাদেবীর চরণে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
এদিকে শারদীয় দুর্গোৎসবের দিনপঞ্জি অনুযায়ী, আগামী মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) উদযাপিত হবে মহানবমী এবং বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমীর বিহিত পূজার মধ্য দিয়ে ভক্তদের চোখের জলে বিদায় নেবেন দেবী দুর্গা। দশমীর দিন বিকেল ৩টার পর থেকে প্রতিমা বিসর্জনের কথা নির্ধারণ করা হয়েছে। মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সার্বিক তত্ত্বাবধান ও নেতৃত্বে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী পলাশীর মোড় থেকে সুসজ্জিত বিজয়া শোভাযাত্রা বের হয়ে বুড়িগঙ্গার সদরঘাটের ওয়াইজ ঘাটে গিয়ে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটবে এই সার্বজনীন উৎসবের।