ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর ওয়াশিংটনের ঐতিহ্যবাহী অন্ধ সমর্থনের নীতিতে এবার স্পষ্ট ফাটল ধরালেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। চলতি মাসে অনুষ্ঠিতব্য ইসরায়েলের নির্বাচনের আগে দেশটির প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন জানাতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তিনি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতানিয়াহুপ্রীতি সর্বজনবিদিত হলেও একই প্রশাসনের ভাইস প্রেসিডেন্টের এমন অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে।
সম্প্রতি সাংবাদিক মার্ক হ্যালপেরিনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন ভ্যান্স। ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন নেতানিয়াহুর প্রতি প্রকাশ্য ও জোরালো সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছিলেন, ঠিক তার পরদিনই এ মন্তব্য করে সবাইকে চমকে দেন তিনি। সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স স্পষ্টভাবে বলেন, তিনি তাকে সমর্থন জানানোর বিরোধী বা পক্ষে—কোনোটিই নন। তিনি মূলত ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে না জড়িয়ে বরং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ও দেশীয় প্রার্থীদের বিজয়ী করার বিষয়েই পুরো মনোযোগ দিতে চান।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, সবশেষ গত এপ্রিলে কোনো বিদেশি নেতার পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছিলেন ভ্যান্স। সে সময় তিনি হাঙ্গেরির সাবেক ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানকে সমর্থন জানান। তবে সেই নির্বাচনে অরবান পিটার মাগিয়ারের কাছে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত হন। এরপর থেকেই বিদেশি রাজনীতিতে নাক গলানো থেকে খানিকটা দূরত্ব বজায় রাখছেন এই মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট।
অথচ নিজের দুটি মেয়াদেই ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতানিয়াহু ও তার ডানপন্থী জোটের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে এসেছেন। প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় থাকাকালে ট্রাম্প মার্কিন দূতাবাস তেল আবিব থেকে বিতর্কিতভাবে জেরুজালেমে স্থানান্তর করেন, গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের সংযুক্তিকরণকে স্বীকৃতি প্রদান করেন এবং ঐতিহাসিক ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিয়ে আসেন। এছাড়া ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যু উপেক্ষিত রেখেই বেশ কিছু আরব দেশের সঙ্গে তেল আবিবের সম্পর্ক স্বাভাবিককরণ চুক্তিতে মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প প্রশাসন তাদের নীতি ধরে রাখে। গাজায় ইসরায়েলের তীব্র সামরিক অভিযান ও গণহত্যামূলক যুদ্ধ চলার মাঝেও তেল আবিবে অস্ত্র সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা হয়। এর পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক সংঘাত তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিরুদ্ধে দমনমূলক ব্যবস্থা নিতে ট্রাম্প কোনো দ্বিধা করেননি।
তবে প্রেক্ষাপট বদলে যাচ্ছে ট্রাম্পের নিজস্ব দলের ভেতরেই। ২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির অন্যতম শক্ত দাবিদার হিসেবে বিবেচিত জেডি ভ্যান্স এখন দলের ভেতরের অসন্তোষের প্রধান কণ্ঠস্বর। ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধজনিত অস্থিরতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে নিত্যপণ্যের দাম ও মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ আমেরিকানদের ওপর চাপ বেড়েছে। আর এই অর্থনৈতিক চাপের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সমর্থনের নীতি নিয়ে খোদ রিপাবলিকান শিবিরে এখন জোর সমালোচনা ও মেরুকরণ তৈরি হচ্ছে।