ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬,  ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাসই গড়বে সুস্থ প্রজন্ম: মীর শাহে আলম নাটোরে প্রবাসীর শপিং মলে হামলা ও লুটপাট, ৫ কোটি টাকার ক্ষতি জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিতে চায় না বিএনপি সরকার: প্রতিমন্ত্রী তিন নিরাপত্তারক্ষীসহ অপহৃত কালাতের রাজপুত্র শাহজাদা আহমেদজাই 'আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স' শব্দ নিষিদ্ধের ঘোষণা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নারী পরীক্ষকের সামনে পুরুষরা কম ব্যথা অনুভব করেন: নতুন গবেষণা উইন্ডিজের বিপক্ষে টস জিতে ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ, একাদশে নেই মুশফিক! কাঁদুনে গ্যাসে ফরাসি বিক্ষোভকারীর মৃত্যু, পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ, দাবি বিরোধী নেতা আইজেনকোটের ফেনারবাখচেকে হারিয়ে ইউরোলিগে ভ্যালেন্সিয়ার দুর্দান্ত জয়

পার্কিংয়ের দাবিতে ঢামেকে অ্যাম্বুলেন্স বন্ধ, চরম দুর্ভোগে সাধারণ মানুষ


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ সময় : ৯:১৭ পিএম

দেশের অন্যতম বৃহৎ ও ব্যস্ততম চিকিৎসাকেন্দ্রে আকস্মিক এক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে মৃত প্রিয়জনের মরদেহ কিংবা জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা গুরুতর রোগীকে নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নির্ধারিত পার্কিং সুবিধা নিশ্চিত করার দাবিতে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক ও চালকদের চলমান এই ধর্মঘটের কারণে পুরো হাসপাতাল চত্বরে এক মানবিক বিপর্যয়কর পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। দীর্ঘক্ষণ গাড়ি না পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন দূরদূরান্ত থেকে আসা অসহায় স্বজনরা।


ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পার্কিংয়ের সুনির্দিষ্ট দাবিতে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট চলছে। এর ফলে জরুরি চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ রোগী এবং তাদের অসহায় স্বজনদের প্রতিদিন চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে কোনো গুরুতর অসুস্থ রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য কোনো হাসপাতালে দ্রুত স্থানান্তর এবং মৃত্যুবরণকারী কোনো ব্যক্তির মরদেহ শেষবারের মতো নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্সও না পেয়ে দিশাহারা হয়ে পড়ছেন স্বজনরা।


গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় গণমাধ্যমের কাছে এই ধর্মঘটের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহাদাত হোসেন।


তিনি জানান, হাসপাতালের নতুন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মো. ফরহাদ হোসেন দায়িত্ব গ্রহণ করার পর হাসপাতাল প্রাঙ্গণ থেকে তাঁদের সব অ্যাম্বুলেন্স আকস্মিকভাবে বের করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে নতুন ভবনের নিচে পার্কিংয়ের স্থায়ী সুব্যবস্থা করার শর্তে তাঁদের নিজেদের উদ্যোগে জায়গাটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করানো হয়। এমনকি সেখানে নিজেদের খরচে সিসি ক্যামেরা, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা ও প্রধান গেটও স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই সেখান থেকেও তাঁদের গাড়িগুলো জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়া হয়।


মো. শাহাদাত হোসেন আরও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হাসপাতালের বাইরে রাস্তায় অ্যাম্বুলেন্স দাঁড় করিয়ে রাখলেও ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্টরা মামলা দিয়ে চালকদের হয়রান করেন। অথচ হাসপাতালে নিয়মতান্ত্রিকভাবে অ্যাম্বুলেন্স পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করার জন্য তাঁরা ইতিমধ্যে কয়েক লাখ টাকা খরচ করেছেন। এমন এক অবর্ণনীয় ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ নিরুপায় হয়েই কেবল পার্কিংয়ের যৌক্তিক দাবিতে তারা বাধ্য হয়ে এই ধর্মঘট পালন করছেন। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে তাদের সমস্ত অ্যাম্বুলেন্স চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। নতুন ভবনের নিচে যে পার্কিংয়ের জায়গায় তাঁরা সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেছেন, সেখানে প্রতিটি গাড়ির বিপরীতে সরকারকে যথাযথ রাজস্ব বা ট্যাক্স প্রদান করতেও তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছেন। মালিক সমিতির ঘোষণা অনুযায়ী, তাদের সুনির্দিষ্ট এই পার্কিংয়ের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই ধর্মঘট অব্যাহত থাকবে।


এদিকে, ধর্মঘটের কারণে সৃষ্ট এই ভয়াবহ অ্যাম্বুলেন্স সংকটে রোগী ও তাদের স্বজনদের চরম ভোগান্তির বাস্তব চিত্র দেখা গেছে পুরো হাসপাতাল প্রাঙ্গণজুড়ে। নারায়ণগঞ্জ থেকে সুদূর ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নিতে আসা মো. শাহীন জানান, তাঁর ৭০ বছর বয়সী দাদি হালিমা বেগমকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের মেডিসিন বিভাগে ভর্তি করিয়েছিলেন। কিন্তু গত মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এরপর দাদির মরদেহ নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য টানা তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে হাসপাতাল চত্বরে খুঁজেও কোনো অ্যাম্বুলেন্স পাননি তিনি।


আর্তনাদ করে মো. শাহীন বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতালে এসেও যে এমন অমানবিক বিপদে পড়তে হবে, তা তিনি কখনো কল্পনাও করেননি। এমনকি হাসপাতাল চত্বরে কোনো সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের দেখাও মিলছে না। স্বজন হারানোর গভীর শোকের মাঝেও প্রিয়জনের মরদেহ নিয়ে যাওয়ার ন্যূনতম সুব্যবস্থা করতে না পেরে তারা চরম অমানবিক ভোগান্তিতে পড়েছেন।


যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে আসা মোহাম্মদ মনির হোসেন জানান, তাঁর বড় ভাগিনা মো. রাসেল (২২) আকস্মিক গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে প্রথমে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে অত্যন্ত সংকটজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। কিন্তু নতুন ভবনের মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় গত মঙ্গলবার বিকেল ৫টার দিকে না ফেরার দেশে চলে যান রাসেল। এরপর ভাগিনার মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য দীর্ঘক্ষণ অ্যাম্বুলেন্সের সন্ধান করেও তা পাওয়া যায়নি।


ব্যথিত হৃদয়ে মোহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, হাসপাতালের একজন চিকিৎসক তাদের পরামর্শ দিয়েছেন ভ্যানে করে মরদেহ নিজ বাড়িতে নিয়ে যেতে! স্বজন হারানোর বেদনায় যখন বুক ফেটে যাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে মরদেহ বহনের একটি গাড়ি না পেয়ে তারা একেবারে অসহায়ের মতো হাসপাতালের মেঝেতে বসে আছেন। এত বড় একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের নজিরবিহীন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, তা তাদের কল্পনারও বাইরে ছিল।


অন্যদিকে, পক্ষাঘাতগ্রস্ত ও গুরুতর আহত শাশুড়িকে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা থেকে সরাসরি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন আব্দুল আহাদ। ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগ থেকে প্রাথমিক প্রক্রিয়া শেষে রোগীকে তাৎক্ষণিকভাবে বিশেষায়িত কিডনি হাসপাতালে রেফার করা হয়। কিন্তু গত মঙ্গলবার দুপুর থেকে অসুস্থ শাশুড়িকে দ্রুত অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করার জন্য বহু খোঁজাখুঁজি করেও কোনো অ্যাম্বুলেন্স পাননি বলে জানান তিনি।


হতাশা প্রকাশ করে আব্দুল আহাদ বলেন, চারদিকে খুঁজেও কোনো সরকারি অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যাচ্ছে না, আর বেসরকারিগুলো ধর্মঘটের কারণে বন্ধ রয়েছে। হাসপাতালের কেউ এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সমাধান বা পরামর্শ দিতে পারছেন না। একজন অত্যন্ত গুরুতর অসুস্থ রোগীকে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাসপাতালের বারান্দায় অলস বসে থাকতে হচ্ছে। অবিলম্বে রোগীকে সময়মতো অন্য হাসপাতালে নিতে না পারলে তার শারীরিক অবস্থা আরও মারাত্মক অবনতি হওয়ার চরম আশঙ্কা রয়েছে।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মচারী ও প্রশাসনিক সূত্র জানান, মঙ্গলবার সকাল থেকেই অনেক অসহায় রোগী এবং স্বজনরা বাধ্য হয়ে তাদের মুমূর্ষু রোগী ও মৃত মরদেহ অটোরিকশা, সিএনজি চালিত অটোরিকশা এমনকি খোলা পিকআপভ্যানে করেও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে হাসপাতাল থেকে নিয়ে গেছেন। যদিও ঢাকা মেডিকেলের মূল গেটের বাইরে বিভিন্ন স্থান থেকে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু বহিরাগত অ্যাম্বুলেন্স আসলেও হাসপাতাল চত্বর থেকে কোনো নিয়মমাফিক বা কাঙ্ক্ষিত অ্যাম্বুলেন্স পাচ্ছিলেন না ভুক্তভোগী রোগী ও তাদের স্বজনেরা। দীর্ঘসময় ধরে তীব্র গরমে ও চরম উৎকণ্ঠায় মরদেহ এবং অসুস্থ রোগী নিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনলেও অ্যাম্বুলেন্সের নাগাল মিলছে না। সাধারণ মানুষের এই অবর্ণনীয় দুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত হাসপাতালের পরিচালক মহোদয়ের উচিত অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসে আলোচনার মাধ্যমে এই সংকটের একটি স্থায়ী ও পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা।


এদিকে, উদ্ভূত এই জনদুর্ভোগ ও জরুরি পরিস্থিতি সম্পর্কে হাসপাতালের সুনির্দিষ্ট বক্তব্য ও করণীয় জানতে একাধিকবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মো. ফরহাদ হোসেনের সরকারি ও ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি এ বিষয়ে হাসপাতালের দায়িত্বশীল অন্য কোনো কর্মকর্তারও তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য বা আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফলে অচলাবস্থা আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।


এ সম্পর্কিত আরো খবর