সৌদি আরবের মাটিতে এক ভয়াবহ ও মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের একাধিক সদস্যসহ মোট সাতজন বাংলাদেশি নাগরিকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। প্রবাসের মাটিতে ঘটে যাওয়া এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনায় পুরো দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এই দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত সকল প্রবাসীর বাড়ি বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলায় বলে নিশ্চিত করেছে জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট।
স্থানীয় সময় শনিবার (৭ নভেম্বর) রাতে জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে হতাহতদের এই মর্মান্তিক তথ্য প্রকাশ করে। কনস্যুলেটের তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ অক্টোবর দিবাগত রাত ২টার দিকে মদিনা থেকে পবিত্র ওমরাহ ও ভ্রমণ শেষে জেদ্দায় ফেরার পথে আল-হিমনা নামক স্থানে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটে। এতে মোট ১৩ জন বাংলাদেশি হতাহত হন, যার মধ্যে ঘটনাস্থলেই তিন পরিবারের সাত সদস্যের করুণ মৃত্যু ঘটে।
দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিরা মূলত তিনটি পরিবারের সদস্য। এর মধ্যে মর্মান্তিক পরিণতি বরণ করেছে জিয়াউর রহমানের পরিবার। এই পরিবারের চার সদস্য—জিয়াউর রহমান স্বয়ং, তার প্রিয় কন্যা বুশরা এবং দুই পুত্র ইয়াসির ও ইয়াযান ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। বর্তমানে তাদের মরদেহগুলো আল-হিমনা জেনারেল হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। এই পরিবারেরই সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া জিয়াউর রহমানের স্ত্রী শাকিরা ও কন্যা ইউসরা বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে শাকিরা খোলাইস জেনারেল হাসপাতালে এবং ইউসরা জেদ্দার কিং আব্দুল আজিজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় লড়ছেন।
অন্যদিকে, আলম শাহের পরিবারের দুজন সদস্য—তার সহধর্মিনী সানজিদা এবং কন্যা ফারিয়া এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের মরদেহ যথাক্রমে আল-হিমনা ও খোলাইস জেনারেল হাসপাতালে রাখা হয়েছে। এই পরিবারের প্রধান আলম শাহ প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেও তার পুত্র ফায়সাল ইস্ট জেদ্দা হাসপাতালে গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া, মাত্র কিছুদিন আগেই ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে এসেছিলেন ইলিয়াসের স্ত্রী আফসানা বিবি। তিনিও এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। তার মরদেহ খোলাইস জেনারেল হাসপাতালে রাখা হয়েছে এবং অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া ইলিয়াস প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ত্যাগ করেছেন। পাশাপাশি, এই বহরের অপর আহত বাংলাদেশি গফুর আলম বর্তমানে খোলাইস জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িটি চালাচ্ছিলেন এক পাকিস্তানি নাগরিক। ট্রাফিক অফিসের প্রাথমিক ধারণা ও তদন্তে উঠে এসেছে যে, দুর্ঘটনার সময় গাড়িটির গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ১৬০ কিলোমিটার। অতিরিক্ত গতির কারণেই চালক নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন এবং গাড়িটি উল্টে যায়। তবে গাড়িচালকের দাবি, হঠাৎ টায়ার ফেটে যাওয়ায় এই মারাত্মক দুর্ঘটনাটি ঘটে। প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষা করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের মধ্যে চারজন আল-আবির কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন বলে জানা গেছে। ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কনস্যুলেটের কাউন্সেলর (শ্রম) একজন আইন সহকারীকে সঙ্গে নিয়ে খোলাইস ট্রাফিক অফিস পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করেন। নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং আহত প্রবাসীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে কনস্যুলেট।