সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বিপুল পরিমাণ বকেয়া চাঁদা ও বিদ্যমান আর্থিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে ‘মারাত্মক আর্থিক ধসের’ মুখে পড়েছে জাতিসংঘ। এই সংকটের কথা তুলে ধরে সংস্থাটির সদস্য দেশগুলোর কাছে সময়মতো পূর্ণ চাঁদা পরিশোধের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। এ সপ্তাহের শুরুতে তিনি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে জাতিসংঘের আর্থিক অবস্থার গুরুতর চিত্র তুলে ধরেন।
চিঠিতে গুতেরেস উল্লেখ করেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে জাতিসংঘের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি সদস্য দেশগুলোকে দুটি বিকল্পের কথা জানান—একটি হলো সংস্থার আর্থিক নিয়ম ও কাঠামো সংস্কারে সম্মত হওয়া, অন্যটি হলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুরো চাঁদা পরিশোধ করা। তা না হলে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা, মানবিক সহায়তা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের মুখপাত্র ফারহান হক বলেন, চাঁদা পরিশোধের বিষয়টি এখন ‘এখনই নয়তো কখনোই নয়’—এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। তার ভাষায়, সদস্য দেশগুলোর দায়বদ্ধতা ছাড়া এই বৈশ্বিক সংস্থার টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।
যদিও মহাসচিব গুতেরেস চিঠিতে কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ করেননি, তবে জাতিসংঘ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থায়ন কমানোর সিদ্ধান্ত এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘসহ ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে সরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি ‘বোর্ড অব পিস’ নামে একটি নতুন উদ্যোগও চালু করা হয়েছে, যা বিদ্যমান বহুপাক্ষিক কাঠামোর বাইরে অবস্থান করছে।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, সদস্য দেশগুলোর মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ও অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচকের ভিত্তিতে বার্ষিক চাঁদার হার নির্ধারণ করা হয়। এই হিসাবে জাতিসংঘের মূল বাজেটের প্রায় ২২ শতাংশ চাঁদা দেয় যুক্তরাষ্ট্র এবং প্রায় ২০ শতাংশ দেয় চীন। তবে বাস্তবতায় অনেক দেশ সময়মতো চাঁদা পরিশোধ না করায় বকেয়ার পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ রেকর্ড ১ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার চাঁদা বকেয়া ছিল।
চলতি মাসের শুরুতে জাতিসংঘ ২০২৬ সালের জন্য ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের বাজেট অনুমোদন করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ কম। বাজেট কমানো হলেও মহাসচিব গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকলে চলতি বছরের জুলাইয়ের মধ্যেই জাতিসংঘের নগদ অর্থ শেষ হয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংস্থাটির নিয়মিত কার্যক্রম চালানো কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।
জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) পর্যন্ত ১৯৩টি সদস্য দেশের মধ্যে মাত্র ৩৬টি দেশ ২০২৬ সালের নিয়মিত চাঁদা পুরোপুরি পরিশোধ করেছে। বাকি দেশগুলোর বড় একটি অংশ আংশিক বা একেবারেই চাঁদা দেয়নি। এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম ও বৈশ্বিক ভূমিকা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।