ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

একটি শিশুর আর্তনাদ ও আমাদের বিবেক


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ০৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ সময় : ৪:০৩ পিএম

রফিকুল ইসলাম রাজু 

একটি সভ্য সমাজের প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে সে সমাজ তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষদের-বিশেষত শিশুদের-কীভাবে রক্ষা করে তার মাধ্যমে। কিন্তু সম্প্রতি রাজধানীতে একটি ১১ বছরের গৃহকর্মী শিশুর ওপর সংঘটিত নৃশংস নির্যাতনের অভিযোগ আমাদের সেই সভ্যতার দাবিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই ঘটনা কেবল একটি ব্যক্তিগত অপরাধের অভিযোগ নয়; এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক নৈতিকতা এবং মানবিক মূল্যবোধের ওপর এক গভীর আঘাত।

 উপরে ছবিতে কোট-টাই পরিহিত এই ব্যক্তির নাম মোঃ সাফিকুর রহমান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স পাস করে বাংলাদেশ বিমানে যোগ দেন। তিনি বিমানের পরিচালক (প্রশাসন) পদ থেকে ৫ আগষ্টের পর এমডি (ব্যবস্থাপনা পরিচালক) হিসাবে যোগ দেন। এই ভদ্রলোক তার বিথী নামের স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে উত্তরার বাসার ১১ বছরের শিশু গৃহকর্মীর ওপর যে কায়দায় নির্যাতন চালায় যা চোখে দেখলে গা শিউরে ওঠে। পুলিশ তার স্ত্রীসহ গ্রেফতার করেছে। এ লোকটির প্রতি ধিক্কার জানাই। আসলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই সব কিছু নয়। আসল পরিচয় তার বংশ ও রক্তে। এ ধরনের হিংস্র মানুষ বিমানের এমডি হয় কি করে?

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যমতে, শিশুটি এমন এক বাসায় নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যেখানে বসবাস করেন রাষ্ট্রীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা। অভিযোগ অনুযায়ী, শিশুটির শরীরে জ্বলন্ত খুনতির ক্ষত পাওয়া গেছে-যা কোনোভাবেই ‘ভুল’, ‘রাগের মাথায়’ কিংবা ‘শাসনের সীমা অতিক্রম’ বলে ব্যাখ্যা করার সুযোগ রাখে না। এটি একটি সম্ভাব্য গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ, যা মানবতার বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেয়।

এই ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো-অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন উচ্চশিক্ষিত, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে অর্থনীতিতে শিক্ষালাভ করা, দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কাজ করা এবং পরবর্তীতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও পদে দায়িত্ব পাওয়া একজন ব্যক্তির বাসায় যদি একটি শিশু এমন নির্যাতনের শিকার হয়, তবে প্রশ্ন উঠতেই পারে-প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কি মানুষকে আদৌ মানবিক করে তোলে?

আমরা বিশ্বাস করতে চাই, এই দেশের আইন এখনো অন্ধ নয়। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, আইনের চোখে সবাই সমান—সে যত বড় পদেই থাকুক না কেন। তাই এই সম্পাদকীয়ের মাধ্যমে আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই—

যদি নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ তদন্তে এই নির্যাতনের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তবে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনতেই হবে।

এখানে কোনো ‘কিন্তু’, ‘যদি’ কিংবা ‘পদমর্যাদা বিবেচনা’ করার সুযোগ নেই।

একটি শিশু কোনো গৃহস্থালির যন্ত্র নয়।

সে কোনো বিকল্প শ্রমশক্তিও নয়।

সে মানুষ-রক্ত-মাংসের মানুষ, অনুভূতির মানুষ, স্বপ্নের মানুষ।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের সমাজে গৃহকর্মী শিশুদের প্রায়ই মানুষ হিসেবে দেখা হয় না। দারিদ্র্য, অসহায়ত্ব আর শ্রেণিগত বৈষম্যের সুযোগ নিয়ে তাদের ওপর চালানো হয় নীরব নির্যাতন-যার অধিকাংশই কখনো আলোতে আসে না। এই ঘটনাটি আলোচনায় এসেছে শুধু এজন্যই নয় যে নির্যাতন ভয়াবহ, বরং এজন্যও যে অভিযুক্ত ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। প্রশ্ন হলো-ক্ষমতাহীন শিশুদের ওপর ক্ষমতাবানদের এই নিষ্ঠুরতা কি আমরা আর মেনে নেব?

আজ যদি একটি ১১ বছরের শিশুর কান্না চাপা পড়ে যায়,

তাহলে আগামীকাল আমাদের সমাজে আর কোনো শিশু নিরাপদ থাকবে না।

শিশু নির্যাতনের ঘটনা শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতা। পরিবার ব্যর্থ হয়েছে, সমাজ ব্যর্থ হয়েছে, রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে। শিশু শ্রম আইন, গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতিমালা, শিশু অধিকার সনদ-সবকিছু কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তব প্রয়োগে আমরা বারবার পিছিয়ে পড়ছি। বিশেষ করে গৃহকর্মী শিশুদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নজরদারি প্রায় নেই বললেই চলে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-এই ঘটনায় নারীর অংশগ্রহণের অভিযোগও উঠে এসেছে। এটি আমাদের সমাজের আরেকটি গভীর সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে-নির্যাতন শুধু পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার ফল নয়, অনেক সময় সামাজিক নিষ্ঠুরতা নারীর মাধ্যমেও প্রকাশ পায়। তাই এখানে লিঙ্গ নয়, অপরাধই মুখ্য হওয়া উচিত।

আমরা কোনো ব্যক্তিকে আগেভাগে দোষী সাব্যস্ত করছি না। কিন্তু আমরা এটাও বলতে চাই—

ন্যায়বিচার মানে অভিযুক্তের অধিকার রক্ষা করা যেমন জরুরি, তেমনি ভুক্তভোগী শিশুর ন্যায্যতা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব।

এই শিশুর চিকিৎসা, মানসিক পুনর্বাসন এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা এখন রাষ্ট্রের নৈতিক দায়। একই সঙ্গে এই মামলার তদন্ত যেন কোনো প্রকার প্রভাব, চাপ বা ক্ষমতার ছায়ায় ক্ষতিগ্রস্ত না হয়-সেটি নিশ্চিত করাও জরুরি।

এই ঘটনাটি আমাদের আরও একটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়—

কীভাবে একজন মানুষ উচ্চশিক্ষা, উচ্চপদ ও সামাজিক সম্মান অর্জন করেও এমন অমানবিক হতে পারে?

সম্ভবত এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের মূল্যবোধের সংকটে। আমরা ডিগ্রি অর্জনকে সাফল্য ভাবি, পদকে ক্ষমতা ভাবি, কিন্তু মানবিকতাকে শিক্ষা দিই না। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র-সবখানেই নৈতিক শিক্ষার অভাব আমাদের এমন এক সমাজের দিকে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে দুর্বলদের ওপর শক্তিশালীদের নির্যাতন প্রায় স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।

এই সম্পাদকীয় কোনো ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ নয়। এটি একটি আহ্বান—

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার আহ্বান,

শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান,

এবং সবচেয়ে বড় কথা-মানবিক সমাজ গঠনের আহ্বান।

আমরা চাই, এই মামলার বিচার হোক দ্রুত।

আমরা চাই, সত্য উদঘাটিত হোক নির্ভীকভাবে।

আমরা চাই, দোষীরা শাস্তির বাইরে না যাক-যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো শিশু এমন নৃশংসতার শিকার না হয়।

কারণ একটি রাষ্ট্রের অগ্রগতি তার আকাশচুম্বী ভবনে নয়,

তার অমানবিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসে।

আজ সেই সাহস দেখানোর সময়।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর