ভারত–পাকিস্তান মুখোমুখি আজ। ক্রিকেট বিশ্বে এই লড়াই নতুন কিছু নয়, তবে এবারের প্রেক্ষাপট একে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাপিয়ে ম্যাচটি এখন কূটনৈতিক টানাপোড়েন, আর্থিক হিসাব–নিকাশ এবং উপমহাদেশীয় রাজনীতির আবহে ঘেরা এক মহারণ। প্রশ্ন একটাই—ক্রিকেটের আঁচে কি বৈরিতার বরফ গলবে?
কলম্বোর হোটেলগুলোতে জায়গা নেই। প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামের ৩৫ হাজার আসনের সব টিকিট আগেই বিক্রি হয়ে গেছে। কালোবাজারে মিললেও দাম চার গুণ বেশি। ভারত থেকে কলম্বো যাওয়ার ফ্লাইটের ভাড়াও আকাশছোঁয়া। শ্রীলঙ্কার ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারির প্রথম ১০ দিনে শ্রীলঙ্কায় আসা ১ লাখ পর্যটকের প্রায় ২০ শতাংশই এসেছেন ভারত–পাকিস্তান ম্যাচটি দেখতে। বার্তা সংস্থা এএফপি ইতিমধ্যেই এটিকে আখ্যা দিয়েছে ‘শোডাউন ইন কলম্বো’—যেখানে দর্শকের রেকর্ড ভাঙার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে এই উত্তাপের পেছনে রয়েছে অনিশ্চয়তার দীর্ঘ ছায়া। কিছুদিন আগেই টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছিল ক্রিকেটের অন্যতম বড় আকর্ষণ এই ম্যাচ। মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশ দলকে নিরাপত্তাশঙ্কায় ভারতে পাঠাতে রাজি হয়নি বিসিবি। বিসিবির শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ আইসিসি না মানায় এবং নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ছাড়াই অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবারের টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ।
বাংলাদেশের বাদ পড়ার ঘটনার পরই অনিশ্চয়তা চরমে ওঠে। পাকিস্তান ঘোষণা দেয়, তারা কলম্বোয় ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কট করবে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানান, বাংলাদেশের পাশে থাকতেই এই সিদ্ধান্ত। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছায় যে বিশ্ব ক্রিকেট বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারত। শেষ পর্যন্ত আইসিসির কূটনৈতিক তৎপরতায় লাহোরে পিসিবি ও বিসিবির সঙ্গে যৌথ সভা হয়। সেখানে কিছু শর্ত পূরণের আশ্বাস দেওয়ার পর পাকিস্তান সরকার পিসিবিকে ম্যাচ খেলার অনুমতি দেয়। ফলে শেষ মুহূর্তে সংকট কাটে।
তবে উত্তেজনার পারদ এখনো নেমে আসেনি। ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ বরাবরই ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় লড়াই। কিন্তু এবারের ম্যাচকে ঘিরে রাজনৈতিক টানাপোড়েন এটিকে ভিন্ন পরিচিতি দিয়েছে। এটি এখন উপমহাদেশীয় ক্রিকেটে বরফ গলানোর এক কূটনৈতিক উপলক্ষও। সে কারণেই আজকের ম্যাচে আইসিসি আমন্ত্রণ জানিয়েছে এশিয়ার বড় পাঁচটি বোর্ডের প্রধানদের।
মাঠের ইতিহাসও কম নাটকীয় নয়। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এশিয়া কাপে দুই দলের অধিনায়ক ও খেলোয়াড়দের হাত না মেলানো এবং ট্রফি বুঝিয়ে না দেওয়ার ঘটনা বৈরিতাকে নতুন করে সামনে আনে। রাজনৈতিক উত্তেজনার ছাপ পড়েছিল মাঠেও। সেই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান অধিনায়ক সালমান আগা গতকাল কলম্বোর সংবাদ সম্মেলনে খেলোয়াড়ি চেতনার ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘খেলাটা ক্রিকেটের চিরাচরিত চেতনার মধ্যেই হওয়া উচিত। আমি কী আশা করি সেটা বিষয় নয়। ক্রিকেট শুরুর পর থেকে যেভাবে খেলাটা হয়ে আসছে, সেভাবেই এটা খেলা উচিত। বাকি সিদ্ধান্ত তাদের (ভারত), তারা যা খুশি করতে পারে।’
ভারতের অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদবও জানিয়েছেন, অনিশ্চয়তা থাকলেও তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন। ‘এই ম্যাচের জন্য আমাদের ফ্লাইট বুক করা ছিল। মনোযোগ ছিল শুধু প্রস্তুতিতে।’ তবে হাত মেলানো প্রসঙ্গে সরাসরি কিছু না বলে তিনি বলেছেন, ‘টসের সময় দেখা যাবে, ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করুন।’
মাঠের লড়াইয়েও রয়েছে বহু উপকথা। টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আটবার ভারতের মুখোমুখি হয়ে একবারই জিতেছে পাকিস্তান। ২০২২ সালের পর ভারতকে হারাতে পারেনি তারা। তবে ভারত–পাকিস্তান ম্যাচে অতীতের পরিসংখ্যান খুব কমই প্রভাব ফেলে। চাপ, আবেগ ও মুহূর্তের সিদ্ধান্তই এখানে নির্ধারণ করে ফল।
আজকের ম্যাচে পাকিস্তানের তুরুপের তাস হতে পারেন অফ স্পিনার উসমান তারিক। তাঁর বোলিং অ্যাকশন নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় নেই। সূর্যকুমার বলেছেন, ‘সিলেবাসের বাইরে প্রশ্ন হলেও সেটা ছেড়ে দেওয়া যাবে না। সে একটু অন্য রকম, তাই বলে আমরা তার কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারি না।’
কেউ কেউ বলছেন, ম্যাচটি হবে পাকিস্তানের তিন স্পিনার বনাম ভারতের ব্যাটসম্যানদের লড়াই। আবার বরুণ চক্রবর্তী ও অক্ষর প্যাটেলের উপস্থিতিতে সমীকরণ উল্টেও যেতে পারে। প্রেমাদাসার উইকেট মন্থর হলেও পুরোপুরি স্পিনবান্ধব নয়। আন্তর্জাতিক টি–টোয়েন্টিতে এখানে পেসাররা পেয়েছেন ৩২৩ উইকেট, স্পিনাররা ২৮২। এ মাঠে ১৫ ম্যাচের ১১টিতেই জিতেছে ভারত। পাকিস্তান সাত ম্যাচ খেলে জিতেছে পাঁচটি।
তবে সব হিসাব–নিকাশের বাইরে আছে আরেক অনিশ্চয়তা—আবহাওয়া। শ্রীলঙ্কার আবহাওয়া বিভাগের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সন্ধ্যায় ম্যাচ শুরুর আগে বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বৃষ্টির সম্ভাবনা ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ। দুই দলই দুটি করে ম্যাচ জিতে সুপার এইটে ওঠার লড়াইয়ে আছে। আজ যে জিতবে, সে-ই উঠবে পরের পর্বে। আর বৃষ্টিতে ম্যাচ পণ্ড হলে পয়েন্ট ভাগাভাগি হবে, কারণ রিজার্ভ ডে নেই।
সুতরাং আজকের ম্যাচ কেবল ব্যাট-বলের লড়াই নয়। এটি আবেগ, রাজনীতি, কূটনীতি ও অর্থনীতির সংমিশ্রণে এক বিরল আয়োজন। কোটি দর্শকের চোখ থাকবে প্রেমাদাসায়। প্রশ্ন থাকবে—ক্রিকেট কি পারবে দুই দেশের দীর্ঘ বৈরিতার বরফে সামান্য হলেও ফাটল ধরাতে? নাকি উত্তাপ বাড়িয়েই শেষ হবে আরেকটি মহারণ?