যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টিনের নথিপত্রে দেখা একটি ছবি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয়েছে। ২০০৬ সালে তোলা এই ছবিতে পদার্থবিদ স্টিফেন হকিংকে বিকিনি পরা দুই নারীর মাঝে বসে হাসতে দেখা গেছে। ছবিটি প্রথমে প্রকাশ করেছে মার্কিন বিচার বিভাগ, পরে বিষয়টি অনুসন্ধান করেছে যুক্তরাজ্যের দ্য টেলিগ্রাফ।
প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, হকিং রোদ পোহানোর চেয়ারে (সান লাউঞ্জার) বসে আছেন। তাঁর দুই পাশে কালো বিকিনি পরা দুজন নারী দাঁড়িয়ে আছেন, হাতে জুসভর্তি গ্লাস নিয়ে। শুরু থেকেই শোনা যাচ্ছিল ছবিতে থাকা নারী দুইজন এপস্টিনের ‘অতিথি’ নন, বরং হকিংয়ের দীর্ঘকালীন দুই সেবাদাতা নারী (কেয়ারার)। তারা যুক্তরাজ্য থেকে হকিংয়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন।
ছবিটি তোলা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিন আইল্যান্ডসের সেন্ট টমাস এলাকার ‘রিৎজ কার্লটন’ হোটেলে, যেখানে হকিং একটি বিজ্ঞান সেমিনারে যোগ দিয়েছিলেন। ওই সেমিনারের বিষয় ছিল কোয়ান্টাম কসমোলজি। ছবির প্রসঙ্গ নিয়ে হকিংয়ের সম্পত্তি দেখাশোনাকারী ব্যক্তিরা জানান, ছবিতে যাদের মুখ ঝাপসা বা আংশিকভাবে ঢাকা, তাঁরা হকিংয়ের নিয়মিত সেবাদাতা।
এপস্টিনের নথিপত্রের মধ্যে ছবি প্রকাশের সঙ্গে রয়েছে আরো নানা তথ্য। ২০০৬ সালে ২১ জন বিজ্ঞানীর একটি দল হকিংসহ এপস্টিনের মালিকানাধীন লিটল সেন্ট জেমস আইল্যান্ডে পৌঁছেছিল। এই যাত্রার উদ্দেশ্য ছিল একটি বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ। হকিংএর জন্য বিশেষভাবে সাবমেরিন নকশা পরিবর্তন করে তৈরি করা হয়েছিল, কারণ তিনি আগে কখনো পানির নিচে যাননি।
নথিপত্রে ২০১৫ সালের একটি ই–মেইলও পাওয়া গেছে। এতে লেখা ছিল, ভার্জিনিয়া জিউফ্রে নামের এক নারীর অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। জিউফ্রে অভিযোগ করেছিলেন, হকিং অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন উৎসবে অংশ নিয়েছিলেন। তবে, হকিং ও এপস্টিন ২০১১ সালে একটি ‘সমকামী ক্লাব’-এ গিয়েছিলেন—এ বিষয়ে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
হকিং ২০১৮ সালে ৭৬ বছর বয়সে মারা যান, দীর্ঘ ৫০ বছরের বেশি সময় মটর নিউরন রোগে (এমএনডি) আক্রান্ত থাকার পর। তাঁর জীবনের উপর ভিত্তি করে হকিং পরিবারের মুখপাত্র উল্লেখ করেছেন, হকিং বিশ শতকের পদার্থবিজ্ঞানে অসামান্য অবদান রেখেছেন। শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসা, ভেন্টিলেটর, হুইলচেয়ার এবং ভয়েস সিন্থেসাইজারের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।
এপস্টিনের সাবেক বান্ধবী গিলেন ম্যাক্সওয়েল বর্তমানে পাচারের দায়ে কারাভোগ করছেন। ম্যাক্সওয়েল বলেছেন, হকিংয়ের নাম এপস্টিনের নথিপত্রে যুক্ত করা ভুল ও অবাস্তব। বিজ্ঞানীদের ওই দল হোটেলের প্রতিটি কক্ষের জন্য প্রতিরাতে ১,৬০০ ডলার খরচ করেছিল। ধারণা করা হচ্ছে, এপস্টিন তাদের আতিথেয়তা প্রদানে পাশের দ্বীপ ব্যবহার করেছিলেন।
ছবিটি তোলা হয়েছিল লিটল সেন্ট জেমস দ্বীপে, যা এপস্টিনের মালিকানাধীন। নথি অনুসারে, হকিং ছাড়াও ২১ জন বিজ্ঞানী, বিভিন্ন নামকরা শিক্ষাবিদ এবং গবেষক ওই দ্বীপে উপস্থিত ছিলেন। যদিও তাদের মধ্যে কেউ কোনো অপরাধে অভিযুক্ত হয়নি।
এর আগে ২০০৬ সালের মার্চে হকিংকে এপস্টিনের দ্বীপে বারবিকিউ পার্টি, নৌকা ভ্রমণ এবং সাবমেরিন ট্রিপে অংশ নিতে দেখা গিয়েছিল। এপস্টিন এমন উদ্যোগ নিতেন যাতে বিজ্ঞানীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি হকিংসহ অন্যদের জন্য বিশেষ সুযোগ তৈরি করতেন।
মার্কিন বিচার বিভাগের নথি প্রকাশের পরও, হকিংয়ের নাম যে কোনো অশালীন কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছে—এ ধরনের ধারণা ভুল ও ভিত্তিহীন। হকিংয়ের সেবাদাতা নারীরা শুধু হকিংয়ের দৈনন্দিন জীবন ও স্বাস্থ্যের যত্ন নিতেন।
স্টিফেন হকিং ছিলেন এক বিশিষ্ট পদার্থবিদ এবং কোয়ান্টাম কসমোলজিতে বিশ্বখ্যাত। তার জীবন ও কর্ম বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী। এমনকি শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তিনি গবেষণা ও প্রকাশনা চালিয়ে গেছেন। হকিংয়ের নাম নিয়ে যেকোনো অশালীন কার্যক্রমের অভিযোগ দুঃখজনক ও ভিত্তিহীন।
এই ছবির আলোচনার মধ্যে দিয়ে হকিং এবং এপস্টিনের সম্পর্ক, এবং নথিপত্রে থাকা তথ্য কেবল বৈজ্ঞানিক সম্মেলন, অতিথি আতিথেয়তা এবং সেবাদাতা নারীদের উপস্থিতির প্রতিফলন।